২০৪ বার পড়া হয়েছে
বইদাদু
হুমায়ূন কবীর ঢালী
ফজরের নামাজ শেষ করে মুসল্লিগণ মসজিদ থেকে যার যার ঘরে ফিরছেন।
সূর্য বাহাদুর এখনো চোখ মেলে তাকাননি। চোখ মেলে তাকাননি গুলশান মাহমুদও। তিনি ঘুমোচ্ছেন। ঠিক সে সময় বাইরে থেকে চাম্বুল কাঠের কাঁচা দরজায় ঠকঠক।
একবার।
দুইবার।
তিনবার…।
ঠকঠক শব্দে গুলশান মাহমুদের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে শিয়রের পাশ থেকে মোবাইল হাতে নিলেন। বাটন টিপে মোবাইলে সময় দেখলেন। ভোর পৌনে ছয়টা।
এই ভোরে আবার কে এলো! গুলশান মাহমুদ মনে মনে বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে দুইটা বেজে গিয়েছিল। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। গ্রামে এসেও সে অভ্যাস বদলাতে পারেননি। যদিও স্ত্রী লাবনীর দৃষ্টিতে দেরিতে ঘুমোতে যাওয়ার একটা বাজে অভ্যাস রপ্ত করেছেন তাঁর স্বামী। কিন্তু কে শুনে কার কথা! এমনকি কার্ডিয়াক ডাক্তার মাহবুবল আলমের নির্দেশও ‘বারোটার মধ্যে বিছানায় যাবেন’; গুলশান মাহমুদ বারোটার মধ্যে বিছানায় যান বটে, ঘুমোতে ঘুমোতে ঠিক দুইটাই বাজে।
দরজায় আবারো ঠকঠক। এবার ঠকঠকের পাশাপাশি কচিকণ্ঠের হাঁকডাক।

বইদাদু, বইদাদু, জলদি ওঠো।
বইদাদু! অবাক হন গুলশান মাহমুদ। বইদাদু আবার কে? এই ঘরে তো কোনো বইদাদু থাকেন না। এই ঘরে বাস করেন গুলশান মাহমুদের মা আনোয়ারা বেগম। বোন তাহমিনা এবং ঢাকা থেকে মাঝেমধ্যে আসার পর গুলশান মাহমুদ ও তাঁর ছেলেমেয়ে। এই যাত্রায় ছেলেমেয়ে আসেননি। এসেছেন তাঁর স্ত্রী মিসেস লাবনী।
ঠকঠক শব্দে লাবনীর ঘুমও ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙতেই মিসেস লাবনী বললেন, এই যে বইদাদু, বিছানা থেকে নেমে দেবদারু গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? শুনছ না, বইদাদুকে কেউ ডাকছেন? দরজা খুলে দেখ তোমার বইনাতিটা কে?
বউয়ের খোঁচার প্রতিবাদ না করে গুলশান মাহমুদ শুধু বললেন, আমি আবার বইদাদু হলাম কবে?
সে হিসাব পরে করো। আগে দরজা খুলে দেখো বইদাদুর নাতিটা কে?
গুলশান মাহমুদ হাতের আঙুলে মাথার চুল ঠিক করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজা খুললেন। দেখলেন, ভোরের নির্ভেজাল আলোয় দরজার সামনে দেবশিশুর মতো পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশু ও অনতি দূরে উঠানে একজন মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। গুলশান মাহমুদ মহিলাকে চিনতে পারলেন। মধ্যপাড়ার ফয়েজ সরকারের বউ শিরিন ভাবি। শিরিন ভাবিকে সালাম দিলেন গুলশান মাহমুদ।
সালামের জবাব দিয়ে ভাবি বললেন, প্রতিবার গ্রামে এসে যত ভেজাল করিস। সবাইকে গল্পের বই দিস। আমার নাতিকে দিস না। কাজটা তো তুই ঠিক করিস না।
শিরিন ভাবির কথায় গুলশান মাহমুদ কিছু মনে করলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন ভাবির এই অভিযোগ ভালোবাসার। স্বজনের প্রতি যৌক্তিক দাবি-দাওয়ার। তাই মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন। বললেন, তাই তো। কাজটা তো আমি ঠিক করিনি। কিন্তু এই সাতসকালে কী ভেজাল করলাম তাই তো বুঝতে পারলাম না।
ভাবি এগিয়ে এলেন ঘরের দরজার কাছে। নাতিকে দেখিয়ে বললেন, এইটা আমার নাতি। সোহেলের ছেলে। গতকাল সারা দুনিয়ার মানুষরে বই দিয়েছিস। অথচ আমার নাতিকে বই দিসনি। কাল থেকে নাতি আমার পাগল করে ফেলছে। বই না পেয়ে কান্না করছে। ভোরে ফজরের আজান দিতেই উঠে বসে আছে। আমাকে টেনে নিয়ে এসেছে তোর কাছে। বলছে, চলো বইদাদুর কাছে। বইদাদুর কাছ থেকে আমাকে বই এনে দাও। ওর চাচাত বোন হাফসাকে কী বই দিয়েছিস? আমার নাতিকেও একই বই দিতে হবে। নয়ত আমাকে পাবনা পাঠাবে। আর আমি পাঠাবো তোকে।…
এবার গুলশান মাহমুদের কাছে ভেজালের বিষয়টি পরিষ্কার হলো। বুঝতে পারলেন গতকাল আমাদের পাঠাগারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে যে বই দিয়েছে শিশুদের, বইনাতি হয়ত কোনোভাবে বাদ পড়েছে। গ্রামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিবছর শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ করে আসছেন তিনি। তাঁর ধারণা, গ্রামের শিশুশিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ এখনো পাঠ্য বইয়ের বাইরে বইপাঠে সচেতন হয়ে ওঠেননি। কিংবা কেউ কেউ সচেতন থাকলেও গ্রামে গল্প-উপন্যাস পাওয়া সহজলভ্য নয়। বাজারে যেসব বইয়ের দোকান আছে, ওখানেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্যকোনো বই বিক্রি করতে চায় না। গুলশান মাহমুদ গত কয়েক বছর বিনামূল্যে বই বিতরণের ফলে গ্রামের শিশুদের মাঝে বই পাঠে একপ্রকার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁর সামনে এই প্রাতঃকালে দাঁড়িয়ে থাকা বইনাতি এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
তাঁর চেষ্টা সফল হতে চলেছে, এই ভেবে মনে মনে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন গুলশান মাহমুদ। তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন মিসেস লাবনীও। কেননা, শিরিন ভাবি ও বইনাতির কথা শুনে মিসেস লাবনীও গুলশান মাহমুদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তবে স্ত্রীর উপস্থিতি গুলশান মাহমুদ টের পাননি। টের পেলেন তখনি, মিসেস লাবনী যখন শিরিন ভাবিকে বললেন, ভাবি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ঘরে আসেন। এরপর নাতিকে দেখিয়ে বললেন, আপনার নাতি নিশ্চয়ই? কী নাম ভদ্রলোকের?
আমার নাম রোদ্দুর। রোদ্দুরের অর্থ জানো তোমরা? বইনাতি জবাব দিল।
চকিত চপল রোদ্দুরের প্রশ্নে গুলশান মাহমুদ ও মিসেস লাবনী দুজনই অবাক হলেন। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। কী বলবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। কয়েক মুহূর্ত পর গুলশান মাহমুদ ইচ্ছে করে মিথ্যা বললেন, আমরা তো রোদ্দুরের অর্থ জানি না। তুমিই বলো।
হায়রে কপাল! রোদ্দুর অর্থ রোদ। সূর্যের কিরণ।

বাহ, তুমি তো দেখছি অনেককিছু জানো। গুলশান মাহমুদ বললেন।
বারে! জানব না কেন? নিজের নামের অর্থ না জানলে কি হয়? আমি কোন ক্লাসে পড়ি জানো?
না, জানি না। মিসেস লাবনী বললেন।
ক্লাস ওয়ানে পড়ি। কিন্তু আমি গল্পের বই পড়তে পারি। তবুও বইদাদু আমাকে গতকাল বই দেননি। কদিন আগে আমাকে যেসব বই দিয়েছিলেন, সেগুলো পড়া শেষ। এরপর মিসেস লাবনীকে বললেন, দাদি, বইদাদুকে বলো আমাকে বই দিতে।
বইপড়–য়া নাতিকে বই না দিলে বইদাদুকে এই গ্রামে থাকতে দেব ভেবেছ? অবশ্যই তোমাকে বই দেবে। তোমার কী ধরনের বই পছন্দ? মিসেস লাবনী জানতে চাইলেন।
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বই। ছড়ার বই। রূপকথার বই। টুনটুনির বই। ঈশপের বই। এখন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বই দিতে বলো।
নাতির কথায় শিরিন ভাবি মুখে হাসির আভা ফুটিয়ে বললেন, এই তোকে এত পাকামো করতে হবে না। মাহমুদ জানে তোকে কী বই দিতে হবে।
না, হাফসাকে যে বই দিয়েছে, আমিও সে বই নেব।
ঠিক আছে, তোমাকে সে বইই দেওয়া হবে। তুমি কি বইয়ের নামটি বলতে পারবে? গুলশান মাহমুদ জানতে চাইলেন।
হুম। কেন বলতে পারব না। ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তবে লেখকের নাম মনে নেই। আমাকে বইটি দেখাও, আমি চিনতে পারব।
ঠিক আছে, ঘরে কিছু বই আছে। দেখ, তোমার পছন্দের বইটি আছে কিনা। গুলশান মাহমুদ বললেন। এরপর শিরিন ভাবিকে বললেন, ভাবি ঘরে আসেন। টেবিলের উপর ওদের উপযোগী কিছু বই আছে। এখান থেকে যেটা পছন্দ নিয়ে নিক।
শিরিন ভাবি ঘরে এসে গুলশান মাহমুদের রুমে বসলেন। রোদ্দুরও এলো। এসেই টেবিলের কাছে ছুটে গেল। একটা একটা বই উলটেপালটে দেখতে লাগল। বিশেষ করে তার পছন্দের বইটি খুঁজতে শুরু করল। গুলশান মাহমুদ কিছু বললেন না। টেবিলের পাশে খাটে বসে রোদ্দুরের বই ঘাঁটাঘাঁটি দেখলেন। গতকাল বই বিতরণের পর বিশ-একুশটা বই রয়ে গেছে। সে বইগুলোই টেবিলে রেখেছে।
মিসেস লাবনী শিরিন ভাবিকে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন, ভাবি বসেন। চা করে দেই?
আরে না। কী আশ্চর্য! এই ভোরে কেউ চা খায়? এটা তোমাদের ঢাকার শহর না। গ্রাম। গ্রামে কেউ এত ভোরে চা খায় না। তোমরা শহরের মানুষ। চা-পানে দিন শুরু করো। আমি তো শুনেছি অনেকে আবার মুখচোখ না ধুয়েই চা খায়। এটা কোনো কথা হলো! ফ্রেশ হওয়ার একটা ব্যাপার আছে না? বাসি মুখে আবার চা খায় কী করে! সে যাক, মাহমুদ আর তুমি গ্রামে গ্রামে বিনামূল্যে বই বিতরণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছ, আমি খুবই খুশি হয়েছি। আজকাল তো শিশুরা একদম বই পড়তে চায় না। তবে আমার নাতি-নাতনিরা ব্যতিক্রম। বইয়ের প্রতি প্রচ- আগ্রহ। এর আগে মাহমুদ যত বই দিয়েছে, সব পড়া শেষ। গল্পের বই পেয়ে তো পাঠ্যবই পড়তেই চায় না। ধমক-টমক দিয়ে পড়াতে হয়।
দাদির শেষ কথাটি রোদ্দুরের কানে পৌঁছে যায়। বই খুঁজতে খুঁজতে প্রতিবাদি হয়ে ওঠে। দাদির কথার প্রতিবাদ করে বলল, দাদি, মিথ্যা কথা বলো কেন? আমি পাঠ্যবই পড়তে চাই না, তোমাকে কে বলেছে? আগে আমি যে সময়টায় ভিডিও গেম খেলতাম, এখন সে সময়টায় গল্পের বই পড়ি।
রোদ্দুরের কথায় সবাই হেসে ওঠেন। গুলশান মাহমুদ বললেন, গুড। ভিডিও গেমের চেয়ে বইপড়া অতি উত্তম। তুমি যত বই চাও এনে দেব। আগামী মাসে আবার আসব বই নিয়ে। এখন যে বইটা নেবে পড়ে শেষ করে ফেলবে। তোমার পছন্দের বইটা কি পেয়েছ?
রোদ্দুরের হাতে দুটো বই। একটা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বই। এটি তার পছন্দের বই। আরেকটি জানা-অজানা বিষয়ে। এটি এখন পছন্দ করেছে। দুটো বই নেওয়ার জন্য গুলশান মাহমুদের কাছে অনুরোধ করল, এটি আমার পছন্দের বই। হাফসাও এই বইটি নিয়েছে। বইদাদু জানা-অজানা বইটিও নিতে চাই। নেব?
ঠিক আছে নিও। কিন্তু একটা কথা বলবে রোদ্দুর? আমাকে বইদাদু বলতে বলেছে কে? কেউ কি শিখিয়ে দিয়েছে?
শিখিয়ে দেবে কেন? তুমি তো বইদাদুই। তুমি খুব ভালো দাদু। সবাইকে বই দাও। এইজন্যই তো তুমি বইদাদু। হাফসাও তো তোমাকে বইদাদু বলে। গতকাল তুমি যখন সবাইকে বই দিয়েছ, আমি তখন আম্মুর সাথে নানার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে দেখি হাফসা নতুন বই পড়ছে। কোত্থেকে পেয়েছিস, জিজ্ঞেস করতেই বলল, বইদাদু দিয়েছে। ও প্রথম বইদাদু বলেছে। তাহলে আমি কি ভুল বললাম?
না, একদম ভুল বলোনি। তুমিও বইদাদুই বলো।
ধন্যবাদ বইদাদু। আগামী মাসে কিন্তু আমাকে বেশি করে বই দেবে।
ঠিক আছে দেব।
রোদ্দুর বই নিয়ে বেরিয়ে গেল। শিরিন ভাবি মিসেস লাবনীর সাথে কথা বলছিলেন। রোদ্দুরকে বেরিয়ে যেতে দেখে তিনিও বিদায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শিরিন ভাবি ও রোদ্দুর বেরিয়ে যেতেই ভালোলাগার এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল গুলশান মাহমুদের দেহমন জুড়ে।
এক রোদ্দুর বই নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আরেক রোদ্দুর এসে তাঁর ঘরের দরজায় আছড়ে পড়ল। অর্থাৎ পূবাকাশে সূর্য বাহাদুর উঁকি দিয়ে গুলশান মাহমুদের আঙিনা আলোকিত করে তুলল।
১ Comment
congratulations.