২১৭ বার পড়া হয়েছে
পোস্ট অফিস এলিজি
ঝর্না রহমান
পোস্ট অফিস নিয়ে আমার আবেগ অন্যরকম। কারণ আমি পোস্টমাস্টারের মেয়ে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে দেখেছি আমাকে সবাই বলে মাস্টার সাবের মেয়ে! আমার জন্মের আগেই আব্বা ‘মাস্টার সাব’ উপাধি পেয়ে গিয়েছিলেন, সেটা স্কুল মাস্টার হিসেবে। আব্বার প্রথম জীবনের চাকরিটা ছিল গ্রামের স্কুলে। তখনই তিনি ‘মাশ্টর’! পরে যোগ দিলেন পোস্টাল ডিপার্টমেন্টে। প্রথমে ক্লার্ক পদে। পরে পোস্ট মাস্টার। সেই থেকে আব্বা মাস্টার সাব! তো পোস্ট মাস্টারের কন্যা হওয়াতে দেশের সব পোস্ট অফিসকে মনে হত আমার ‘বাপের বাড়ি’ ( আমরা থাকতামও পোস্ট মাস্টার্স কোয়ার্টারে)!
প্রযুক্তির বিকাশের কল্যাণে চিঠিপত্রের জায়গা দখল করল ইমেইল আর ডাকবিভাগের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ালো কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। প্রথমে এরা সুঁই হয়ে ঢুকলো। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য চার্জে দ্রুত পৌঁছে দিচ্ছিল চিঠিপত্র, পার্সেল। কিন্তু দিনে দিনে এরা ফাল হয়ে ফালা ফালা করে দিতে লাগলো পাবলিকের পকেট! ডেলিভারি চার্জ বাড়ছে রোজ, সেই সাথে পার্সেল প্যাকেট হিসেবে পলিথিনের মোড়ক বাধ্যতামূলক করছে, যার জন্য পার প্যাকেটে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি গুনতে হয়। আর এই হলুদ পলিথিনগুলো পরিবেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু তাতেও কুরিয়ারের প্রতি মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে বই কমছে না! ফলে যা হবার হয়ে গেল। গত বিশ বছরে পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট ধুকে ধুকে একটা ভর্তুকি খাওয়া প্রতিষ্ঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘বাপের বাড়ি’র (পোস্ট অফিসগুলোর) দৈন্যদশা আমাকে ক্রমশ কাতর করে ফেলে। এর মধ্যে সবচেয়ে কাতর করতো নিউমার্কেট পোস্ট অফিস।

স্বনামধন্য আর বহু পুরোনো এই পোস্ট অফিসটি আমার জন্ম থেকে শুরু করে ২০২১ পর্যন্ত আবেগ আর বাস্তবতার সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে ছিল। আমার যখন জন্ম হলো, ৩৯ নবদ্বীপ বসাক লেনের এক ছোট ভাড়া বাসায়, তখন আমার আব্বা চাকরি করতেন এই নিউমার্কেট পোস্ট অফিসে। পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট মানে বদলির চাকরি। সারা জীবনে আব্বা অনেক পোস্ট অফিসে চাকরি করেছেন, কিন্তু নিউমার্কেট পোস্ট অফিস আর জিপিও-র স্মৃতিচারণই করতেন বেশি। সেই নিউমার্কেট পোস্ট অফিসের সাথে আমার গাঁটছড়া বাঁধা হল চাকরিসূত্রে। মাস্টার সাবের মেয়ে আমিও ‘মাস্টারি’ চাকরিতেই ঢুকলাম। মানে শিক্ষকতা। আমার কলেজ পিলখানায় বিডিআর ক্যাম্পাসে। বাসাও সেখানেই, টিচার্স কোয়ার্টারে। প্রায় ৩৬ বছর চাকরিসূত্রে আমি হলাম ঐ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা! নিউমার্কেট হল আমাদের বাজারঘাট, শপিং, ডাকঘর, ঠিকানা – সব। নিউমার্কেট ডাকঘরকে আমি পেলাম প্রথমে একতলা ভবন। তরপর একসময় তা দোতলা হল। নিচতলায় অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম। দোতলায় পাবলিক। চওড়া সিঁড়ি, সারিসারি কাউন্টার। খোলা লাউঞ্জে গোটা ছয়েক উঁচু ডেস্ক। তাতে লোকজন দাঁড়িয়ে চিঠির খামে নয় মানি অর্ডার ফরমে ঠিকানা লিখছে, ডাকটিকেট লাগাচ্ছে। ধ্বমাধ্বম শব্দ হচ্ছে সিল মারার। সেরকম জমজমাট! দারুণ লাগতো এই পরিবেশ। ওখানে গেলেই আমার চোখে ভাসতো, আব্বা তাঁর টেবিলে বসে আছেন, আশেপাশে ছড়ানো চিঠিপত্র। কেউ রানারের ঝুলি বাঁধছে, কেউ মেশিনের মত এক ছন্দে সিল মেরে যাচ্ছে চিঠিতে, কেউ কেরোসিন কুপির আগুনে গালা পুড়িয়ে পার্সেলের গায়ে ফোঁটা ফোঁটা ঢেলে তার ওপর সাবধান ঠেসে দিচ্ছেন সিলমোহর! ঐ গালাপোড়া গন্ধও আমার ভালো লাগতো। রাশি রাশি কাগজের চিঠি, ক্যাম্বিশের ব্যাগ, মোটা সুতোর কোটিং দেয়া ব্রাউন কাগজের পার্সেল প্যাকেট, ময়দা জ্বাল করা আঠা – সব মিলিয়ে একটা বিবশ করা স্মৃতির গন্ধ! আমার ভালো লাগতো। কিন্তু ধীরে ধীরে নিউমার্কেট পোস্ট অফিস জৌলুশ হারিয়ে ফেললো। সরকারী অফিসগুলো এমনিতেই কর্মচারিদের অসচেতনতা, অবজ্ঞা উপেক্ষা আর পরিচ্ছন্নতা বোধের অভাবে হতশ্রী দশায় পড়ে। একবার বিদেশ থেকে আগত একটা পার্সেল আনতে পরপর তিনদিন নিউমার্কেট পোস্ট অফিসে যেতে হল। অন্ধকার শ্রীহীন কর্মহীন বিষণ্ন অফিসটাকে মনে হচ্ছিল বেওয়ারিশ কোনো মুমূর্ষু রোগী। এত মন খারাপ হল! তারপর আমাদের জীবনে চিঠির পাট চুকলো। বেতার টেলিভিশনের চেকটেক তুলতে হলে রেভিনিউ স্ট্যাম্প লাগে শুধু সে প্রয়োজনেই পোস্ট অফিস মাঝে মাঝে ডাক দেয়। বিডিআর ক্যাম্পাসেও একটা পোস্ট অফিস ছিল। এক কামরার ছোট্ট একটা অফিসঘর। সেখানে পোস্টমাস্টার সাহেবই চিঠিতে সিল মারেন, স্ট্যাম্প খাম এসবও বিক্রি করেন। একবার আমি অফিসে ঢুকে মাস্টার সাবকে বললাম, আমি আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি। তিনি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, কেন ম্যাডাম, কলেজে চিঠিপত্র ডেলিভারিতে কোনো প্রবলেম হয়েছে? তো, তিনি যখন জানলেন আমি পোস্ট মাস্টারের মেয়ে আর আমার বাবা এক সময় নিউমার্কেট পোস্ট অফিসেও চাকরি করেছেন, আর আমি এসেছি পোস্ট অফিসের ‘আত্মীয়তাসূত্রে’! তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন! ত্রিশ বত্রিশ বছরের তরুণ সেই পোস্ট মাস্টারকে ‘বাপের বাড়ি’র ছেলে হিসেবে দশ মিনিটের আলাপেই আপনি থেকে তুমিতে প্রোমোশন দিয়েছিলাম!
করোনা শুরু হওয়ার আগ দিয়ে আমার চাকরির পাট চুকলো। এলাকাও বদল হলো। ধানমণ্ডি ছেড়ে বসুন্ধরা। করোনার ‘স্টে-হোম’ কালে ঘর হৈতে আঙিনা বিদেশ! তো নিউমার্কেট রইলো দূরান্তর!
তারপর মাস সাতআট আগে একদিন রেভিনিউ স্ট্যাম্প কেনার জন্য নিউমার্কেট নেমে দেখি পোস্ট অফিস হাপিশ! ভবনটাও উধাও! বাজারের মুদি দোকানে খুচরো বিক্রি হয় স্ট্যাম্প। শুনলাম, এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও ভালো করে পোস্ট অফিসটি নির্মাণ করা হবে। অন্য কোথাও? কিন্তু এটাই তো ডাকঘরের জন্য নির্ধারিত জায়গা! অফিসটার জন্য মন কেমন করে উঠলো। খালি জায়গাটা দাঁড়িয়ে দেখার উপায় নেই। পাশ ঘেঁসেই উঠেছে বিশাল গার্বেজ স্টোরেজ। দুর্গন্ধে তিষ্ঠানো দায়। কদিন আগে আবার নিউমার্কেট গেলাম। গাড়িটা ড্রাইভার ঐ গেটেই রাখলো। স্ট্যাম্পও দরকার। নানা দোকান ঢুৃঁড়ে শেষমেশ পাওয়া গেল। দশ টাকার স্ট্যাম্প বারো টাকা। কিন্তু পোস্ট অফিসের জায়গাটা তেমনি খা খা করছে। ইটপাটকেল লোহালক্কড় কিছুরই নামনিশানা নেই! অফিসটা উঠছে কোথায়? কেউ বলতে পারলো না।
খামে ভরে চিঠি পাঠানোর যুগ আর নেই। এক হাতে লণ্ঠন আর এক হাতে ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজিয়ে পিঠে খবরের বোঝা নিয়ে ছুটে চলা রানারের যুগ ফুরিয়েছিল বহু আগে। রানারের ইতিহাস শুধু সুকান্তের কবিতায়ই আছে! আব্বার অফিসে দেখতাম, চিঠি বিলি করা এমপ্লয়ীকে বলতো পোস্টম্যান। পোস্টম্যান ডাকঘরের লাল গাড়িতে মুখ বাঁধা চটের ব্যাগে চিঠি নিয়ে উঠে পড়তো অথবা সাইকেলে ব্যাগ ঝুলিয়ে যার যার পোস্টাল এরিয়ায় চলে যেতো। একুশ শতকে এসে চিঠির যুগ পুরোপুরি ফুরোলো। লাল লেটার বক্স চলে গেছে জাদুঘরে। কিন্তু নানারকম পার্সেল, সঞ্চয়পত্র, মানি অর্ডার এসব তো আছে! মোবাইল মানি অর্ডার, নগদ ব্যাংকিং এসব ডিজিটাল সেবাও যুক্ত হয়েছে। সুতরাং পোস্ট অফিসও নিশ্চয়ই থাকবে! একটা পোস্ট অফিস ঐ এলাকার ঠিকানার প্রতীক। ডিজিটাল এই যুগে পোস্ট কোড এখন জাতীয় আইডেন্টিটির অংশ! আর আমার জন্য তো আত্মপরিচয়! রবি ঠাকুরের অমল এক অদৃশ্য ডাকঘর থেকে রাজার চিঠি আসার অপেক্ষায় দিন গুনে গুনে তার রোগজর্জর সময় পার করেছিল, আমিও তেমনি দিন গুনতে থাকি, আমাদের রাজা শিগগিরই আমার জন্য গোটা ডাকঘরটিই পাঠিয়ে দেবেন! এই নিউমার্কেটেই!
(ছবি: আব্বার প্রযত্নে আমার কাছে লেখা চিঠির খাম, আমার পরিচয় আর ঠিকানা! আমার আব্বার শেষ কর্মস্থল ছিলো সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউজ পোস্ট অফিস। এ অফিসটিও বেশ কয়েকবছর আগে উঠে গেছে! আমার আব্বাও প্রয়াত হয়েছেন ৩২ বছর!)
______________
লেখক: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত কবি।
১ Comment
অনেক ভালো লাগলো পোস্ট অফিস সম্পর্কে স্মৃতির আলোচনা করেছেন। আমাদের পোস্ট অফিস এখনো আছে।
তবে সময় উপযোগী করে যদি পোস্ট অফিস সরকার সাজাতো তাহলে এই পোস্ট অফিস ও লাভ জনক প্রতিষ্ঠান হতো বলে আমার বিশ্বাস।