২৩৭ বার পড়া হয়েছে
পাচার
আফছানা খানম অথৈ
আক্কাস ছিল গ্রামের বখাটে ছেলে।সে মেয়েদেরকে খুব ডিস্টার্ব করতো।একদিন মনির মাস্টারের মেয়েকে ইভটিজিং করার দায়ে তার বিরুদ্ধে সরাসরি ম্যাজেট্রেট কোর্টে ইভটিজিং মামলা দায়ের করা হয়।ইভটিজিং আইনের নিয়ম হচ্ছে সরাসরি বাদী-বিবাদী নিয়ে আদালত বসা হয়।আসামী দোষী প্রমাণ হলে সঙ্গে সঙ্গে জেল হাজতে।মামলা দায়ের করার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজেট্রেট ছুটে আসল গন্তব্য স্থলে।প্রথমে শিক্ষক তারপর উপস্থিত জনগনের কাছ থেকে রিপোর্ট নিলো।সবার এক কথা,
স্যার আক্কাস ছেলেটা আসলে বদমায়েশ বখাটে। শুধু মাস্টারের মেয়ে নয়, সব মেয়েকে ডিস্টার্ব দেয়।ওরে ভালো মতে সাজা দেয়া দরকার।
ম্যাজেট্রেট সাহেব আর দেরী করলেন না।তাকে ধরে জেলে দিলেন।কয়েক মাস জেল খাটার পর আক্কাস জেল থেকে বের হলো। সেখানে পরিচয় হলো আরেক দাগী আসামী মুন্না’র সঙ্গে। তার চতুমূর্খী অবৈধ ব্যবসা।নারী পাচার,শিশু পাচার,মদ,গাজা, ইয়াবা…।
আক্কাসকে মুন্নাকে ব্যবসার সকল কৌশল শেখাচ্ছে।সম্পূর্ণ শেখা শেষ এবার অপারেশন শুরু,প্রথম অপারেশন নারী পাচার, শিশু পাচার,মদ গাজা হিরোইন সব কাজে সে সাকসেস।মুন্না খুশি হয়ে বলে,
ভেরি গুড আক্কাস তোমার দ্বারা হবে।এত অল্প সময়ে তুমি যে এতটা আগাবে, আমি তা ভাবতে পারিনি।আজ থেকে তুমি আমার পার্টনার।
ওকে ভাইজান,আমি রাজী।
মুন্না আর আক্কাস পার্টনার হয়ে অবৈধ ব্যবসা চালাচ্ছে।আক্কাস এখন আর আগের মতো নেই।চেহারায় ফকফকে ভাব,স্বাস্থ্যের পরিবর্তন,শার্ট ফ্যান্ট,সু ট্রাই,চোখে কালার ফুল চশমা।তারা পালাক্রমে একদিন একেক অপরিচিত জায়গায় গিয়ে চাকরী দেয়ার নাম করে গরীব মা-বাবাকে ভুলিয়ে কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে সুন্দরী মেয়েদের এনে বিভিন্ন দেশে পাচার করে।অবিভাবকদেরকে ভুল ঠিকানা দিয়ে আসে।তারা মেয়েদেরকে খুঁজতে এসে কেঁদে কেঁদে ফিরে যায়।এমনি ভাবে তারা রাতা-রাতি বড় লোক হয়ে উঠল।
একদিন আক্কাস মুন্নাকে নিয়ে তার নিজ গ্রামে ফিরে আসল।প্রথমে গ্রামের দোকানে দেখা হলো তার বন্ধু ফরিদ’র সঙ্গে।সে তার সঙ্গে করমর্দন করে বলল,
দোস্ত কেমন আছিস?
ফরিদ তাকে চিনতে পারেনি।তাই তার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।কিছুক্ষণ পর ফরিদ বলল,
স্যার আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
আক্কাস হা হা হো হো করে হেসে উঠে বলল,
দোস্ত আমি স্যার না।আমি আক্কাস।উনি আমার স্যার।
ফরিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
দোস্ত তোর এ অবস্থা হলো কি করে?
কোন অবস্থা দোস্ত?
বলছি,তোর চেহারা,পোশাক,ট্রাই,কালার ফুল চশমা এসব কি করে হলো?
দোস্ত সবই ভাগ্য বুঝলি, সবই ভাগ্য।ভাগ্য সব সময় এক রকম থাকে না।সময় মতো বদলে যায়।আমি আর আগের আক্কাস নেই।আমি এখন বড় চাকরী করি।অনেক টাকা মাইনে।উনি আমার বস।
ফরিদ অনুনয়ের স্বরে বলল,
দোস্ত আমারে একটা চাকরী দেনা,আমি খুব কষ্টে আছি।
দেব ভাই দেব।আগে চা খাও। পরে সব কথা হবে।
আক্কাস,মুন্না ফরিদ দোকানে বসলো।আক্কাস দোকান ভর্তি লোকজন সবার জন্য চা নাস্তার অর্ডার করলো।চা খেতে খেতে আক্কাস বলল,
আমর বসের শহরে একটা কাপড়ের ফ্যাক্টরী আছে।এই ফ্যাক্টরীর জন্য কিছু মহিলা শ্রমিকের প্রয়োজন।আপনাদের মধ্যে যদি কোন গরীব আত্মীয়-স্বজন থাকে তাহলে আমার বসের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।আমরা অগ্রিম দুতিন মাসের বেতন দিয়ে যাব গাড়িয়ানের হাতে।
মত প্রকাশ করতে আর দেরী হলো না।কয়েক জন বলল,
আমার অমুক আত্মীয় ছেলে মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্ট করছে।স্বামী ফেলে রেখে গেছে, কোন খোঁজ খবর নেই।তার একটা চাকরীর দরকার।
এমনি ভাবে দশ পনেরো জন অসহায় নারীর সন্ধান দিলো কিছু লোকজন। মুন্না বলল,
আক্কাস ওদের নাম ঠিকানা ফাইলে লিখে নাও।কাল তাদের সঙ্গে দেখা করবো।
তালিকা দেয়া লোকজন মনে করলো কথাগুলো সত্যি এবং চাকরী দেয়াটাও সত্যি।যদি চাকরীটা হারিয়ে যায়,তাই অসহায় নারীদের তাড়াতাড়ি স্বাবলম্বী করার জন্য বলল,
স্যার কাল কেন, এখন চলেন?
মুন্না একটু ভাব দেখিয়ে বলল,
না মানে অপরিচিত জায়গা কাল গেলে হয় না?
ফরিদ সহ সবাই বলল,
স্যার কোন সমস্যা হবে না।আমরা আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
মুন্না মিটিমিটি হেসে হেসে বলে,কাম সারছে,মানুষ গুলো আমাদেরকে খুব বিশ্বাস করলো।এবার লক্ষ লক্ষ টাকা কামানো যাবে।তাকে চুপ থাকতে দেখে ওরা আবার বলল,
স্যার কিছু বলছেন না যে,বললাম না কোন সমস্যা হবে না।আমরা নিয়ে যাব আপনাকে।
এতক্ষণে মুন্নার ভাবনার ঘোর কাটল।সে বলল,
ঠিক আছে চলুন।ফরিদ প্রথমে নিয়ে গেল তার এক খালাতো বোনের বাড়িতে।দুটো বাচ্চা নিয়ে সে খুব কষ্ট করছে।অনেক দিন থেকে তার স্বামী নিখোঁজ।ফরিদ ঘরের সামনে গিয়ে অজিফা বুবু বুবু বলে ডাক দেয়।অজিফা দরজা খোলে ফরিদকে দেখে বলে,
ভাই এত রাতে কি মনে করে?
বুবু আগে বসতে দাও।পরে সব কথা বলবো।
অজিফা কোন কথা না বলে সবাইকে বসতে দিলো।তারপর ফরিদ বলল,
বুবু উনি হলো আক্কাস ভাইয়ের বস।উনার শহরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরী আছে।এখন উনার কিছু অসহায় মহিলা কর্মীর দরকার।তুমি খুব কষ্ট করছ বিধায়, আমরা তোমার কথা বলেছি।উনি তোমাকে নিতে রাজী হয়েছেন।ভালো বেতন পাবে।মাসে দশ হাজার টাকা। দুমাসের টাকা অগ্রিম দিয়ে যাবে।তুমি রাজী থাকলে বল?
অজিফা খুব কষ্ট করছে।তাই অগ্রিম টাকা ও ভালো বেতনের কথা শুনে খুশি হয়ে বলল,
ফরিদ ভাই,আমি চাকরী করতে রাজী।তবে ছেলে মেয়ে দুটো কি করবো সেটাই ভাবছি।
তখনি মুন্না বলল,
আত্মীয়-স্বজন কেউ থাকলে তাদের কাছে রেখে যান।আমি তাদের থাকা খাওয়ার খরচের টাকা দিয়ে দেব।
অজিফার দু:সম্পর্কের এক খালাতো বোনের কাছে বাচ্চা দুটোকে রাখার সিদ্ধান্ত নিলো।তারপর বলল,
ফরিদ ভাই আমি চাকরী করবো।উনাকে বলেন টাকা দিতে। আমি আমার খালাতো বোনের কাছে বাচ্চা দুটোকে রেখে আসব।
মুন্না পকেট থেকে কচকচা বিশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল বের করে তার হাতে দিয়ে বলল,
আজ রাতের মধ্যে বাচ্চা দুটোকে রেখে এসে রেডি হয়ে থাকবেন।ভোর পাঁচটার মধ্যে আমাদেরকে রওয়ানা করতে হবে।
ঠিক আছে স্যার,আমি রেডি হয়ে থাকব।
মুন্না সবাইকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে বের হলো।তারপর গেল আরেক বাড়িতে,তারপর আরেক বাড়িতে….।
এমনি ভাবে তারা সিরিয়াল অনুযায়ী প্রায় বিশ জন অসহায় মহিলার বাড়িতে গেল।সবাইকে অগ্রিম বিশ হাজার টাকা করে দিয়ে চাকরী করতে রাজী করালো।ভোর পাঁচটার গাড়িতে মুন্না আক্কাস বিশজন মহিলা নিয়ে রওয়ানা করলো।তারা সময় মতো শহরে উঠল।দশ তলা বিশিষ্ট একটা বাসায় তারা উঠল।বিশজন মহিলা কে কোথায় থাকবে সেটিং করে দেয়া হলো।তাদের টেক কেয়ার করার জন্য বুয়া আর মডেলিং করার জন্য বিউটিশিয়ান রাখা হলো।প্রত্যকের রুমে সময় মতো উন্নত মানের খাবার পৌছে গেল।আক্কাসকে দেখে অজিফা বলল,
আক্কাস ভাই আমরা চাকরী করবো কখন থেকে?
এক সপ্তাহ পর।
আক্কাস ভাই,এক সপ্তাহ পর কেন?
বোন এত সহজ কথাটা বুঝলে না।তোমরা গ্রামের মানুষ শহরের ভাষা বুঝবে না।তাছাড়া তোমাদেরকে স্মার্ট করতে হবে।বসের অফিসের সব লোক বিদেশী।তোমাদের এ গ্রাম্য পোশাক তাদের পছন্দ হবে না।এক সপ্তার মধ্যে তোমাদের গ্রাম্য পোশাক গ্রাম্য ভাষা ছেড়ে শহুরে ভাষা শহুরে পোশাক পরতে হবে।তারপর ঐ অফিসে চাকরী করতে হবে।
অজিফার মতো করে আক্কাস সকল মহিলাকে বুঝিয়ে বলল।সপ্তাহ খানের মধ্যে তাদেরকে অনেকটা মডেলিং করে তুলল।তারপর একদিন মাঝ রাতে সবাইকে গাড়ি করে বিমান বন্দরের কাছাকাছি নিয়ে এলো।মুন্না আক্কাস দুজন নেমে পড়লো।তখনি অজিফা বলল,
আক্কাস ভাই আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
কোথায় আবার অফিসে,একটু পরে আমাদের বিদেশী বস আসবেন।তাকে তোমাদেরকে বুঝিয়ে দেব।
আক্কাস ভাই তাকে বুঝাবেন কেন?
আহা বোন এত সহজ কথাটা বুঝলা না।তোমরা উনার অধীনে কাজ করবে। আজ থেকে উনি তোমাদের বস।
বলতে না বলতে একটা দামী গাড়ি তাদের কাছাকাছি এসে ব্রেক করলো।গাড়ি থেকে নামল এক মধ্যবয়সী লোক।সুট ট্রাই,চোখে কালার ফুল চশমা।মুন্না এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করলো।তারপর একটু দূরে গিয়ে পরামর্শ করে নিলো মুন্না,
বস এবার একটু রেট বেশী দিতে হবে।
সমস্যা নেই,যা চাইবে তা পাইবে।তা কত জন এনেছ?
বস কম না।বিশ জন ওদের পিছনে আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে।আনতে যা কষ্ট হয়েছে।
ওকে টাকা গুনে নাও।মাল বুঝে দাও।
ওকে বস।
বসের হাত থেকে ব্যাগ ভর্তি টাকা বুঝে নিয়ে মুন্না সবাইকে বসের গাড়িতে তুলে দিলো।যাবার বেলায় অজিফা সহ সবাই বলল,
বস আমরা কোথায় যাচ্ছি?
বিদেশে।
বিদেশে কেনো?
আহা এত সহজ ব্যাপারটা বুঝলে না।বিদেশে আমাদের একটা ফ্যাক্টরী আছে।তোমরা ওখানে চাকরী করবে।আজ থেকে উনি তোমাদের বস।উনি যা বলবে তা শুনবে।আমি প্রতি মাসে তোমাদের প্রত্যকের বাড়ি টাকা পাঠিয়ে দেব।
ওরা আর কিছু বলল না।
মুন্না আক্কাস ব্যগ ভর্তি টাকা নিয়ে হাসতে হাসতে বাসায় ফিরে আসল।
এদিকে দুমাস পার হওয়ার পর সবাই আক্কাস আর বসের নাম্বারে কল দিলো।কোনমতে কল সার্ভিস হচ্ছে না।বারবার চেষ্টা করলো,কোন মতে কল সার্ভিস হচ্ছে না।সবাই এক জোট হয়ে ইউ পি চেয়ারম্যান’র কাছে গেল।ইউ পি চেয়ারম্যান সব কথা শোনার পর রেগে উঠে বলল,
আক্কাস একটা বাজে লোক।তার কথা বিশ্বাস করে তোমরা এত গুলো নারীর সর্বনাশ করলে।এখন আমি কি করবো?যা করার তোমরা কর।
সবাই নম্র স্বরে বলল,
চেয়ারম্যান সাহেব আমরা বুঝতে পারেনি।আমাদেরকে ক্ষমা করুন।অসহায় নারীদের উদ্ধার করতে সাহায্য করুন।
চেয়ারম্যানের সহযোগিতাতে সবাই একত্র হয়ে আক্কাস আর মুন্নার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলো।ছবি সব অন লাইনে সকল থানাতে তাদের তথ্য পাঠিয়ে দেয়া হলো।থানা কর্তৃপক্ষের লোকজন খুব কেয়ারফুলি তাদেরকে খুঁজছে শুরু করলো।হঠাৎ দেখলেন, বিমান বন্দরে আক্কাস মুন্না,ও সেই বিদেশী লোক, সঙ্গে পনেরো বিশজন মহিলা।তারা বুঝতে পারলো এসব মহিলাদেরকেও চাকরী দেয়ার নাম করে পাচার করতে এনেছে।অমনি পুলিশ সুপার তার দল বল নিয়ে তাদেরকে আটক করে, রিমান্ডে দিলেন।পুলিশের পিটানি খেয়ে সব সত্য প্রকাশ করলো তারা তিন জন।তারপর মাসব্যাপী অভিজানের পর বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বিভিন্ন দেশ থেকে “পাচার” করা অসহায় নারীদের উদ্ধার করেন পুলিশ।আদালত পাচারকারীদের সাজা দিলেন যাবৎ জীবন কারাদন্ড।
ঃসমাপ্তঃ