১৯০ বার পড়া হয়েছে
নৈতিক শিক্ষা শূন্যের ঘরে
(শীরীন আক্তার)
০৬/০৬/২০২২
জাতি আজ শোকে স্তব্ধ, হতবাক। অশ্রু বিসর্জন করতেও ভুলে গেছে। নির্বাক বিষণ্ণ চোখ মেলে আছে টিভি ও মোবাইলে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কন্টেইনার ডিপোর মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ আর লাফিয়ে লাফিয়ে আগুনের আজরাইল ছড়িয়ে পড়েছে ওই অঞ্চলের কয়েক মাইল পর্যন্ত। ১৪ ঘণ্টার মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ২৯টি ইউনিট মিলেও পারছেনা সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কখনও লাশ হয়ে যেতে শোনা যায়নি। অথচ সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোর আগুনে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও নিমেষেই লাশ হয়ে গেছে! কারো পা,কারো হাত সহ পুরো মানুষটিই কয়লা হয়ে গেছে। মোবাইলে ভিডিও ও কথা বলতে বলতে হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে নিখোঁজ হয়ে গেছে সে যুবক।এইযে আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেলো অর্ধ শত খেটে খাওয়া মানুষ! শত শত মানুষ আহত অবস্থায় মৃত্যুর সাথে লড়ছে ; এর জবাব কে দেবে? কেন তাদের এ অবস্থা হলো?
কেউই তো জানতো না তারা নিমেষেই জ্বলে পুড়ে আহত / নিহত হবে! অনেকের লাশও শনাক্ত করতে পারছেনা তাদের আত্মীয় স্বজন। কেন তাদেরকে এভাবে মরতে হলো? কে দায়ী এ মৃত্যুর জন্য? কত মা-বাবা আজ সন্তান হারা হলো, কত বোন ভাই হারালো, কত নারী বিধবা ও কত শিশু পিতা হারালো এই হিসেব কে রাখবে! কেন এমন হলো। টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিলে কী মানুষগুলো ফেরত আসবে সেই শূন্যতা পূরণ করতে? কেন এ প্রশ্ন করছি,কাকে করছি আমি জানি না!শুধু জানি আজ সারা বাংলাদেশে কান্না শোনা যাচ্ছে। মিডিয়ার বদৌলতে গোটা বিশ্বের মানুষ তা দেখছে। দেখে এ দেশের মানুষের অমানবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাচ্ছে। এ মানুষগুলো তো মরেনি! ওদেরকে জঘন্য ভাবে হত্যা করেছে এক শ্রেণির মানুষ। ওরা মানুষ রূপের নরঘাতক, অমানুষ! ওদের সীমাহীন লোভ আজ এ সাধারণ জনগণকে খুন করেছে। এ খুনীকে অবশ্যই কঠিন শাস্তি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।
সকল ধর্মেই লোভ, হিংসা ও অহংকারকে মানুষের চিরশত্রু রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয় ” লোভ, হিংসা, অহংকার — এ তিন মানুষের ধ্বংসের কারণ “। আজ এইযে শত শত মানুষ মৃত্যুর সাথে লড়ছে, অনেকে মরে কয়লা হয়েছে এর জন্য লুটেরা ধনী কন্টেইনার মালিকদের অপরিমেয় লোভকেই দায়ী করতে হয়। তারা সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য কী কী জিনিস ওই কন্টেইনারে করে এনেছে তা গোপন করেছে। এ গোপনের পরিণতি আজ এ লাশের মিছিল! এতে যে মানুষগুলো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো, আরও যারা মৃত্যুর অপেক্ষায় আছে, কেউ কেউ আজীবন পঙ্গুত্বের সাথে বসবাস করবে ; এই ক্ষতি পূরণ কী ওই লোভী দানব রূপী কন্টেইনার মালিকেরা দিতে পারবে?
আমাদের দেশটা পৃথিবীতে একটি ছোট দেশ। শিক্ষা দীক্ষায় ও পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে। তারপরও ১৯৭১ সনে সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৩০ লক্ষ শহীদের ও প্রায় ৩ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মহান স্বাধীনতা লাভ করেছি। মাত্র কিছুদিন আগে মহা ধুমধামে স্বাধীনতার ৫০ বছর বা সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্ যাপন করেছি। অনেক প্রতিকূল অবস্থার সাথে বিরামহীন যুদ্ধ করে করে মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হয়েছি। সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দেশের আপামর জনগণের জীবন যাত্রার উন্নয়ন সাধনের। কিন্তু সরকার মানে তো শুধু প্রধানমন্ত্রী নন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত শত শত জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত সরকার। একটি দেশ তখনই উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করে যখন নীতিনির্ধারকদের বেশির ভাগ দেশপ্রেমিক ও জনদরদী হয়।
একটি ঘরের কর্তা শতভাগ সৎ হলেও অন্য সদস্যরা কর্তাকে ফাঁকি দিয়ে যদি অসৎ পথে যায় ; তার তখন হাহুতাশ ছাড়া কিছুই করার থাকেনা। প্রবাদ আছে ” চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী “। পরিবারকে বলা হয় রাষ্ট্রের অণু। একটি পরিবারের প্রধানকে সবাই যদি শ্রদ্ধা ও মান্য করে তবেই সে পরিবার তর তর করে উন্নতি করবে। এক্ষেত্রে কর্তাকে হতে হবে কঠোর। যদিও কঠোর ও কোমল দুটি বৈশিষ্ট্যই থাকতে হবে একজন সৎ মানুষের মধ্যে। তবে কোমল হতে হবে খুব হিসেব করে। অপরাধীকে তার অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। যদি লঘু পাপে গুরুদণ্ড আর গুরু পাপে লঘু দণ্ড হয় তাহলে হবেনা। অবশ্যই বড়ো অপরাধীকে কিছুতেই ক্ষমা করা যাবে না। তাকে শাস্তি দিতে হবেই। তবেই পরিবারের অন্য সবার কাছে তা দৃষ্টান্ত হবে। তখন তারা আর অপরাধ করার সাহস পাবেনা।
আমাদের দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এদের কঠোর ভাবে দমন করতে হবে। দুর্নীতির কারণেই দেশের উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে। তাই তৃণমূল পর্যায় থেকে মন্ত্রী পরিষদ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সিন্ডিকেটকারীদের ও শাস্তি দিতে হবে। দুর্নীতির মূল কারণই হচ্ছে লোভ। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আত্মস্বার্থ সিদ্ধির জন্য লোভের দ্বারস্থ হয়।তাই তারা নির্ধারিত বেতনের বাইরে উপরি পাওয়ার জন্য কলমের খোঁচায় পুকুর চুরি করে। ওরা কিন্তু কেউ অশিক্ষিত নয়। উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই যদি লোভের বশবতী হয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে, তাদের সে শিক্ষার কোনো মূল্য থাকে না। আত্মসংযমী, সৎ,, নির্লোভ, নিরহংকার ও অহিংস হওয়াই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
আমি আবারও ফিরে আসি সীতাকুণ্ডের আগুন প্রসঙ্গে। এ ডিপোর মালিক অশিক্ষিত বা গরীব ব্যক্তি নয়।হাজার হাজার কোটি টাকার ও শিক্ষিত সে মালিক। তার তো লোভী হওয়ার দরকার নেই। যে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই অশিক্ষা ও দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে। নিত্য অভাবের ভারে জর্জড়িত। আর টাকাওয়ালারা হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে ও আরও হাজার কোটি টাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সেই লোভের বলি আজ হতদরিদ্র এ মানুষগুলো। ওই অসৎ ও দানবদের লোভের কারণেই প্রতিনিয়ত মানুষ পুড়ে মরছে, ডুবে ও সড়ক দুর্ঘটনায় মরছে।
করোনা ভাইরাসে গত দুই / আড়াই বছরে যে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তারচেয়ে চারগুণ মারা গেছে বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। এ দুর্ঘটনার কারণ ও লোভ। লোভে পড়েই সবাই দুর্নীতিবাজ হয়।ধর্ম বা বিদ্যার উপদেশের ওরা ধার ও ধারেনা। এদেশে তাই হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর মৃত্যু বরণ করছে। আরেক গোষ্ঠী দেশে বিদেশে বাড়ি গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেঞ্চ করছে। ওরা মৃত্যুর কথা ভাবেনা। মৃত্যুর পরে এসব কিছুই তো কবরে যাবে না। খেয়ে পরে অপরকে সাহায্য সহায়তা করে সুন্দর জীবন যাপন করতে তো হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। নাম, যশ খ্যাতির জন্য ও টাকা মূল নিয়ামক নয়। জ্ঞান ও ধর্ম চর্চাসহ প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ধনী লোক কখনো লোভী, হিংসুক ও অহংকারী হতে পারে না। তার দ্বারা অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়না। হাজার হাজার মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়।
আমাদের তাই উচ্চ ডিগ্রিধারী হলেই চলবেনা। হতে হবে উন্নত চরিত্র ও শিক্ষার অধিকারী। আমাদের অতি শৈশবে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি বই ছিলো। নাম ‘ বাল্য শিক্ষা ‘। ছোট্ট একটি চটি বই। কিন্তু বিশাল এক জ্ঞানের ভাণ্ডার। ও-ই একটি বইই শিশুর সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও শিক্ষক ছিল। তখন শিক্ষার হার কম ছিল, কিন্তু যারা শিক্ষিত ছিল তারা প্রকৃতই জ্ঞানী ও সচ্চরিত্রের ছিল।
বর্তমান কালের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে গেছে বাণিজ্যিক ও বুলিসর্বস্ব। “কেতাবে আছে গোয়ালে নেই ” মার্কা। শিক্ষার হার বেড়েছে আর জ্ঞানী লোকের সংখ্যা কমেছে। ভালো মানুষকে এখন সমাজ মূল্য দেয়না। তাই সমাজ ক্রমশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। মিথ্যাবাদী, লোভী, দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীরা হচ্ছে জনপ্রতিনিধি। সার্টিফিকেটধারী অজমূর্খরা চেয়ারে বসে দৌরাত্ম্য করছে। সৎ মানুষের ঠাঁই নেই কোথাও। তাই চলছে জ্বালাও, পোড়াও ও ধর্ষণের মত ঘৃণ্য অপরাধগুলো। এর থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা। সৎভাবে জীবন যাপনের শিক্ষা দিতে হবে পরিবার থেকে অতি শৈশবেই। তাকে শেখাতে হবে -“” মিথ্যা বলা মহা পাপ।” ” লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু “। মিথ্যাকে বর্জন করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। সকল পাপের মূল মিথ্যা কথা বলা। সীতাকুণ্ডের আগুনের মূলেও কাজ করেছে এই মিথ্যা। কন্টেইনারে দাহ্যপদার্থ আছে এটা গোপন করা হয়েছে। ঠিক তেমনি সকল দুর্ঘটনার কারণ ও ত্রুটিযুক্ত যানবাহন ও লাইসেন্সহীন ড্রাইভার। সুপ্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সধারী চালক হলে দুর্ঘটনা হতোনা।
তাই মানুষের নৈতিক চরিত্রের উন্নতি সাধনের বিকল্প নেই। তার জন্য অবশ্যই দরকার প্রকৃত শিক্ষা। লোভ করতে নেই, হিংসা করতে নেই, বংশ, ধন, রূপ ইত্যাদির অহংকার করতে নেই। এগুলো মানুষকে সহজেই ধ্বংস করে। এ শিক্ষাগুলো শিশুকে শৈশবেই দিতে হবে। শুধু পরীক্ষার খাতায় নির্দিষ্ট সিলেবাস মুখস্থ করিয়ে খাতায় লিখে পাশ করার নাম শিক্ষা নয়।এ রকমের শিক্ষায় কোন প্রাণ বা মনোযোগ বসে না। এটা কুশিক্ষা।
সৎ শিক্ষাটা ধরিয়ে দিতে হবে তার মগজে, দৈনন্দিন আচার আচরণে। বাড়িতে অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষকদের কথা ও ব্যবহারে। আমাদের শিক্ষায় এখন এটা নেই বললেই চলে। আজকাল প্রাক প্রাথমিক থেকেই আমাদের কোমলমতি শিশুদের চাপ প্রয়োগ করে মুখস্থ করানো হয়। স্বাভাবিক আনন্দের মাধ্যমে ওরা শিক্ষা পায়না। তাই পরীক্ষার খাতা পর্যন্তই ওদের শিক্ষার পরিসর। মগজে মননে, আচার আচরণে সে শিক্ষার টিকিটিও পাওয়া যায় না। শুধু পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে শিশুদের শিক্ষা গিলানো হয়। স্বপ্রণোদিত হয়ে আগ্রহী মনে, আনন্দের সাথে শিশু শিক্ষা পায়না। তাই এখন শিক্ষার হার বাড়লেও নৈতিক শিক্ষা শূন্যের ঘরে চলে গেছে। এ বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনেক সচেতন হতে হবে। তবেই দেশের উন্নয়ন সাধন সম্ভব হবে।
স্বত্ব সংরক্ষিত
গন্ধরাজ, মাইজদী, নোয়াখালী।
১ Comment
congratulations