৩৭৩ বার পড়া হয়েছে
তেঁতুলিয়া ঘুরে এসে লিখেছেন ভ্রমণ কাহিনি।, রোকসানা পারভীন রুশী।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপর
একটি শিশিরবিন্দু।
কবি গুরুর সেই বিখ্যাত কবিতার মতো অনেকেই আমরা টাকা পয়সা খরচ করে দূরে পাহাড়-পর্বতমালা, সিন্ধু দেখতে যাই অথচ নিজের বাড়ির পাশেই কত সুন্দর-সুন্দর জায়গা সেটাই দুচোখ ভরে দেখা হয় না – এই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার বোন ভাগনীরা প্লান করলো এবার বাড়ির পাশেই আরশিনগর দেখতে যাবে মানে লালমনিরহাটের পাশেই পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া, বাংলাবান্ধা দেখতে যাবে।

আমার পুত্রের ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে ওর বাবা কে বলে প্লান পাশ করে ৯ই ডিসেম্বর চলে গেলাম ঢাকার কল্যানপুর মাজার রোডে শাহআলী বাস কাউন্টারে। আগেই অনলাইনে টিকিট কাটা হয়েছিল।
বাস ছাড়ল সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে। যমুনা ব্রীজ পার হয়ে সিরাজগঞ্জের শেরপুরে ফুড ভিলেজে যাত্রা বিরতি ২৫ মিনিট দিলেন। আমরা নেমে ফ্রেশ হয়ে এখানকার বিখ্যাত গোরুর মাংসের ভুনা আর সবজি, ডাল দিয়ে লাঞ্চ করলাম। তারপর বাইরে এসে হাঁটাহাঁটি করলাম। বিরতি শেষে আবার যাত্রা শুরু করলাম লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে।
ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের দূরত্ব ৩৩১.৮ কি.মি। বাসে সাধারণত ৯ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় কিন্তু এখন হাইওয়ে চার লেনের কাজ চলছে তাই ১২ ঘন্টায় পৌঁছালাম।
রাতে খেয়ে একটু কথা বলেই ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১২টা বেজে গেল। ভোর বেলা ৫ঃ৩০ বড় বোন ফোন দিয়ে তাড়া দিলো সকাল ৭ টায় মেজ বোন মাইক্রো নিয়ে আসবে আমরা যেন দেরি না করি। আহারে লেপমোড়া দিয়ে আরামের ঘুমটা নষ্ট হলো। জার্নির ক্লান্তি নিয়েও উঠে ফ্রেশ হয়ে রেডি হলাম সবাই।
সকালের নাস্তা খেতে খেতে বড় বোন, বড় বোনের মেয়ে ও নাতনী, মেজ দুই বোন তাদের দুই মেয়ে সবাই চলে আসলো।
সবাই মিলে মা কে বলে আমরা ৯ জন রওয়ানা হলাম পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে।
মেজ বোন শেলী সে হাইস্কুলের টিচার। টিচার হওয়ার জন্য না সে আগে থেকেই প্রচুর কথা বলে আর হাসায়।
সারা রাস্তা সে পেট ফাটানো, দম আটকানো হাসির বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
মাঝে মাঝে রাস্তায় বিরতি দিয়ে হালকা, চা, পানি খেয়ে খেয়ে মজা করতে করতে পঞ্চগড় চলে গেলাম।
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। ১৯৮৪ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ৫টি উপজেলা নিয়েই পঞ্চগড় জেলা গঠিত।
পঞ্চগড় বিখ্যাত বিশেষ করে চায়ের জন্য তাছাড়া
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর,
করতোয়া নদী,

এশিয়ান হাইওয়ে,
বার আউলিয়ার মাজার,
ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ
মিরগড়,
তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলো,
গোলকধাম মন্দির
আনন্দধারা,
মহারাজার দিঘী,
মহারানী বাঁধ,
রকস মিউজিয়াম আরো অনেক কিছু। জেলাটি সর্বউত্তরে অবস্থানের জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘা সবচেয়ে পরিস্কার ভাবে দেখা যায় বলে জেলাটি দর্শনীয় সৌন্দর্যমন্ডিত একটি জেলা।
লালমনিরহাট থেকে পঞ্চগড়ের দুরত্ব ১০৯ কি.মি।গাড়িতে গেলে লাগে ৩ঃ৩০ মিনিট। আমরা থেমে থেমে যাওয়াতে ৫ঘন্টা লেগেছে।
দুপুর ২ টায় আমরা করতোয়া নদীর পাশেই হোটেল করতোয়াতে লাঞ্চ করলাম। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন আমার মেজ বোনের ৮৯ ব্যাচ গ্রুপের কিছু সংখ্যক বন্ধু। অসাধারণ অমায়িক বিনয়ী অতিথিপরায়ণ পঞ্চগড়ের মানুষ। বড় ভাইয়েরা আমাদের লাঞ্চ করালেন। গল্পগুজব, ফটোসেশান করে আমরা তেঁতুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার।
৮৯ ব্যাচের জালাল ভাই আমাদের মাইক্রোর সামনে বসে লিড দিলেন আর মেজ বোনের মেয়ে বাইকে করে আর এক বড় ভাই বুলবুল ওনার সাথে চললো।

পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার অসাধারণ সুন্দর রাস্তা, কংক্রিকেটের তৈরি। কোরিয়ান কোম্পানির তৈরি এই হাইওয়ে রাস্তা। শুনলাম ২০ বছরেও নাকি তিল পরিমান কিছু হয় নি। গাড়ি যেন প্লেনের গতিতে স্মুথলী চলতে লাগলো।
যেতে যেতে পথের দুইপাশে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। ম্যাপের চিকেন নেক অংশটায় যখন আসলাম তখন রাস্তার পাশেই লাগোয়া ইন্ডিয়ান চা বাগানগুলো। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। গাড়ি থামিয়ে বেশি দূরে না গিয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম। কেউ কেউ মজা করছে,” ভুলেও কেউ পা বাড়াস না তাহলে ফোলানির মতো হতে হবে। অদূরেই ওয়াচটাওয়ার থেকে সব দেখছে কিন্তু। “। আবার হাসির রোল।
নয়নাভিরাম সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতে তেঁতুলিয়ার বিখ্যাত সেই জোড়া তেঁতুলগাছের নিচে চলে আসলাম।
সেখান থেকে ডানে মোড় নিয়ে তেঁতুলিয়া জিরো পয়েন্ট এলাম। পাশেই মহানন্দা নদীর পাড়ে ২০০ বছরের পুরনো ডাকঘর। পাশেই ডাকবাংলো।
মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছি। একটু দূরেই নদীর ওপাড়ে ইন্ডিয়ান বর্ডার বেরিয়ার এর সাথে চা বাগান গুলো দেখা যাচ্ছে।
এই স্পট থেকেই স্পষ্টভাবে ভুটানের কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বর্গীয় চূড়া দেখা যায়।
ছবি তুলতে তুলতে ফোন চলে আসলো বুলবুল ভাইয়ের, আমরা মেইন রাস্তা থেকে ডানে কাজি এন্ড কাজির আনন্দধারায় না ঢুকে আগেই ডাকবাংলোয় চলে আসছি তাই।
খুব দ্রুত আমরা গাড়িতে যে যার যায়গায় উঠে বসলাম। দ্রুত চলে গেলাম কাজি এন্ড কাজির টি এস্টেট রওশানপুরে।
পঞ্চগড় শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে।
দেশের সর্বপ্রথম সমতলভূমিতে অর্গানিক চা এর চাষ এখানে শুরু করা হয়।
বিশেষ অনুমতি নিয়ে এই সবুজ অরণ্যে ঢুকতে পারলে ভ্রমনের উদ্দেশ্য সফল। বিমোহিত ও মুগ্ধকর জায়গা
দৃষ্টিনন্দন গেট, গেটের ডানদিকে লতা পাতায় জড়ানো গুহার মতো টানেল। এটা পার হলেই মুগ্ধকর কিছু কটেজ চোখে পড়ে। একটা কটেজ থেকে আর একটা কটেজের সংযোগ ওভার ব্রিজ দিয়ে। ব্রিজগুলো যেন রুপকথার প্যালেসের লবি। গুল্মলতায় ছাওয়া একেকটা কটেজ।
পুকুরঘাট, চা বাগান, সবুজ বন-বনানী দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা জুড়ে এই আনন্দধারা অবস্থিত।
একটা বিস্ময়কর ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে সায়াহ্নের বেলা বের হয়ে ফিরে এলাম মহানন্দার পাড়ে।
নদীর ওপারে ইন্ডিয়ান স্ট্রিটলাইটগুলো জ্বলছে। আমরা কেউ পাড়ে বসলাম কেউ কেউ ছবি তোলায় ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। এরপর ফিরলাম লাগোয়া ডাকবাংলোয়। আগে থেকে বুকিং করা তিনটা রুমে আমরা উঠে গেলাম। তখনও হাসির খচখচানি শেষ হয়নি। অনবরত হেসেই যাচ্ছি একেকজনের একেক কথায়।
সবাই ফ্রেশ হয়ে বাংলোর সামনে বসলাম। খোশমেজাজে খোশগল্প চলছে ।
৮ টার দিকে আমি ও আমার পুত্র আর মেজ বোনের মেয়ে বাদে সবাই রাতের খাবারের জন্য বের হলো।একঘন্টা পর আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসলো সবাই।
গল্পের মাঝে আমরা খেলাম।
খাওয়া শেষ করে আবার গল্প আর হাসি।
আমাদের জার্নির প্রথম থেকেই কোথাও নামলে সবাইকে গুণে গুণে তোলা হত। আর যে গুণতো তাকে বাদ দিয়ে গুণে বলা হত একজন কম সে কোথায়? এই নিয়ে হাসির রোল।
রাতে ঘুমানোর আগে যে গুণতে গেলো তাকে বলা হলো দেখিস তোকে বাদ দিয়ে গুণিস না। আবারও সেই হাসি। একেকজনের দুষ্ট মিষ্টি জোকস শুনে হাসতে হাসতে রাত ১টায় ঘুমাতে গেলাম। 

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য সকাল ৬ টার আগেই উঠে মহানন্দার পাড়ে বসে রইলাম। তখনো নদীর ওপাড়ে ইন্ডিয়ার বর্ডার বেরিয়ারের লাইটগুলো জ্বলতেছে।
পাথরশ্রমিকরা নদী থেকে পাথর তোলার জন্য পানিতে নেমে পাথর তুলে সংগ্রহ করছে।
যতই সময় পার হচ্ছে ততই কুয়াশা বাড়তে শুরু করলো আর আমাদের মন খারাপ হওয়া শুরু করলো।
মন খারাপের মাঝে গরম গরম ভাপা পিঠা কিনে খেলাম আমরা।
৭ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে না পেরে আমরা সবাই চলে গেলাম হোটেলে নাস্তা সারতে।
নাস্তা সেরে বাংলোর বিল পরিশোধ করে মহানন্দার তীর ধরে বাংলাবান্দা স্থলবন্দরের দিকে এগুতে লাগলাম।
নদীতে তখন অগুনতি পাথরশ্রমিক কাজ করছে। যত দূর যাচ্ছি পথের দুইপাশে যত বাড়ি দেখা যাচ্ছে উঠোন জুড়ে শুধু পাথর আর পাথর। কোথাও কোথাও ট্রাকে পাথর লোড আনলোড করা হচ্ছে৷
আগে এই অঞ্চলের প্রান্তিক লোকের চা উত্তোলন ছিল প্রধান পেশা এখন পাথর উত্তোলন। কেননা চা উত্তোলনের মজুরির থেকে পাথর উত্তোলনের মজুরি অনেকগুণ বেশি, এই তথ্য চা ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে জানতে পেয়েছি পরে।
বাংলাবান্ধা যেতে খুব একটা সময় লাগলো না। অসাধারণ স্মুথ রাস্তা হাই স্পিডে ১৬.৬ কিলোমিটার দ্রুত চলে গেলাম।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে একটু দূরে গাড়ি থামালো।
আমরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছি। একটু দূরে ডগ স্কোয়াডের বিশাল একটা কুকুর নিয়ে দাঁড়িয়ে কর্তব্যরত বাংলাদেশি ( বিজেবি) বর্ডার গার্ডএর কয়েকজন।কুকুরটা ছটফট করছে।তাদের প্রধান এগিয়ে এলেন। কোথা থেকে এসেছি শুনলেন। আমাদের বুঝিয়ে বললেন কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবো। পিছনে ইন্ডিয়ান বর্ডার গার্ড বা তাদের যেন ছবি তোলা না হয়।
মোটাতাজা কুকুরটা তখনো দাঁত খেঁচিয়ে ছটফট করছে। তাকে শক্ত করে ধরে আছে একজন।

দশ পা এগুতেই দেখি একটা ইন্ডিয়ান গোরুর বাছুর গেট দিয়ে বের হয়ে বাংলাদেশ চলে আসলো ভিসা ছাড়াই। আমরা এটা দেখে হাসতেছিলাম। আমরা অপেক্ষা করছিলাম এটাকে কে নিয়ে যায় দেখার জন্য। একটু পরেই দেখি গোরুর মালকিন এক উপজাতি মহিলা আর একটা ছোট ছেলে বের হয়ে গোরুর বাছুরটাকে খেদিয়ে খেদিয়ে আবার গেট দিয়ে ঢুকিয়ে নিয়ে গেল ।
অদূরেই আমরা হাসাহাসি করে নিজেদের মধ্যে বললাম, ” চোর মানেনা ধর্মের বারণ আর গোরু মানেনা ইমিগ্রেশন আইন। “
২০ মিনিটের মতো থাকলাম। যে যার মতো ছবি তুলে গাড়িতে বসলাম। গাড়ি এসে থামলো বিসমিল্লাহ টি ফ্যাক্টরিতে।
ফ্যাক্টরির মালিক পরিচিত হওয়ার সুবাদে আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে কাঁচা পাতা থেকে আস্তে আস্তে শুকনো চা বের হয়ে আসে। পরে
আমাদের চা পানি খাওয়ালেন। ধন্যবাদ ও বিদায় জানিয়ে হাসি, মজা, খানা-পিনা করতে করতে রওয়ানা হলাম কান্তজিউ এর মন্দির দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে।
অসাধারণ একটা ট্রিপ ছিল বোন ভাগনীদের সাথে। 

একঘেয়েমি ক্লান্তিকর জীবন থেকে মুক্তির স্বাদ নিতে চাইলে ভ্রমণ আবশ্যকীয়। ভ্রমণ করলে যেমন জীবনের বা কাজের ক্লান্তি দূর হয় তেমনী কাজে উজ্জীবন হওয়া যায় আর সারাবছর চলার রসদ জোগানো যায়।
তাই সুযোগ পেলেই পাশে -পাশে, দূরে, বিদেশ যেখানেই পারুন পরিবার পরিজন নিয়ে বেডিয়ে আসুন মন ভরে নিয়ে আসুন জীবন সঞ্জিবনী শক্তি।
রোকসানা পারভীন রুশি।
১১.১২.২০২১
ঠিকানাঃ
৫৮/৬৩ -১ হোসনী দালান
বকশীবাজার, ঢাকা।
১ Comment
very good job; congratulations.