চিরচেনা স্বর
তসলিমা হাসান
অনেক বছর পর হঠাৎ যদি তুমি পেছন থেকে
পুরনো নাম ধরে ডাকো
আমি অনায়াসে তোমার স্বর চিনে ফেলবো।
কারণ -এই যে চিরচেনা স্বর।
একটা সময় যে স্বর না শুনলে ঘুম হতো না,
প্রতিটা মূহুর্ত কাটতো সেই কন্ঠস্বরের কিছু মধুময় মাতাল করা ভালোবাসার গল্পে,
রোজ শুনতে হতো যে স্বরের
মিষ্টি আলাপ আর অভিমানী কিছু কথা।
বহুবছর পর যদি একসাথে আবার দেখা হয়,
চোখে চোখ পড়ে যদি দুজন দুজনের,
তাহলে তুমি হয়তো চোখটা ফিরিয়ে নিবে,
কিন্তু আমি চোখে ফেরাতে পারবো না
আমি অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবো।
সত্যি তোমার আর ফেরার পথ নাই।
তুমি এখন এক বটবৃক্ষ যার শেকড় ও ডালপালা বহুদূরে চলে গেছে।
মানুষ সত্যি বদলে যায়।
কিন্তু চলে যায় না বহুদূরে
দূরে থেকেও যেন অনেক কাছে
যেন মনের রাজ্যে বসবাস।
মনে হয় এই শহরে কিংবা আমাদের আশপাশ।
কিন্তু বুকের ভিতর রেখে যায়
অবিশ্বাসের এক বড় ক্ষত!
সেই ক্ষত বয়ে চলি আমরা কিছু পরাজিত মানুষ।
সবকিছু কি এত সহজে ভুলা যায়??
তসলিমা হাসান
কানাডা,০৩-০১-২০২২
আম-কাঁঠালের নিবিড় ছায়াতলে
ভোরের বাতাসে ঝরিয়া পড়ে চালতা ফুল,
শিশিরে ভিজিয়া যায় চাল কুমুর;
আসমান হইতে ঝরিয়া পড়ে সকালের কাঁচা রোদ,
ডালিম গাছে মৌটুসী উড়িয়া বেড়ায় ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ ;
সন্ধ্যার পিঙ্গোল ছোপ দুবলার গহীনে,
ঘাপটি মারি বসিয়া রয়-ঝিঝি বউ রে;
চড়ুই পাখির ডাক শুনি-অই কৃষাণীর ঘরে,
মধ্য রাতে শেয়াল ডাকে-দুরের কোন এক ঝাউ বনে;
গ্রামের আঁকা-বাঁকা মেঠপথ ধরে,
গো-পাল,মেষ পাল ছুটিয়া চলে;
মাঠ জুড়িয়া সোনালি ফসলের বাহার,
এখনি তো সময় রং-বেরঙ্গের প্রজাপতি উড়িবার ;
দুপুর বেলা যখন পুরো গ্রাম রয় নিরব,
তখন বাতাসে ভাসিয়া আসে পাতি ঘুঘুর ক্ষিণ রব;
দুর অচলে বয়ে চলে ঝর্ণার রাশি রাশি জল,
সরু নদের বুকে নাও চলে ছলছল ;
অই না পানসী পুকুর পাড়ে, কিশোরীর দল নৃত্য করে নুপুর পায়ে,
নুপুরের সুরে গান বাধে ধবল বলাকার দলে;
রাখাল তার ক্লান্ত তনু এলিয়ে দেয় -অশ্বত্থের ছায়াতলে,
তার বাঁশির মিহি সুরে মূর্ছনা যায় প্রকৃতি যে;
হেমন্তের আগমনে, জীবনের আহ্বানে,
আধামরা প্রাণগুলো সতেজ হয়ে ওঠে, ফসল কাটিবার আনন্দে ;
উঠোনে উঠোনে বেজায় ব্যস্ত-বয়ে-ঝিয়ে,
কেউ উড়ায় ধান, কেউ দেয় পা,কেউ ভানে বাড়া;
ছইল কাঁদিয়া কাঁদিয়া হাঙ্গুর টানে ব্যস্ত মায়ের পিছে,
নিরাশ হইয়া খেলায় মাতে ছাগ-ছানার সাথে ;
মহিষের শিংয়ের মতো বাঁকা চাঁদ ওঠে অঘ্রাণের রাতে,
তাহার কমল প্রভার ভিড়ে, মানব-মানবী মাতিয়া ওঠে নিগূঢ় আলিঙ্গনে;
করতোয়ার চিকমিকি বালু চর জুড়িয়া,
সবুজ কাশবন পবনে পবনে ওঠে দুলিয়া;
তিশির ভুঁইয়ে বালক- বালিকার দল,
খেলে বর-কনে, গীত গানে করে শোরগোল ;
আম-কাঁঠালের নিবিড় ছায়াতলে,
অভাগা হালিমা সুখ-দুখের গল্প রচে ছেড়া কাথার ফোঁড়ে;
ধূলা-কাদা ভরা বন্ধুর পথে চলে গরুর গাড়ি,
এসব গাড়িতে চড়ে নয়া ঝি-নাইওড় যায় বাপের বাড়ি;
বিহান বেলার নিবু নিবু রোদ্দুর পড়ে পল্লী -প্রকৃতির প’রে,
কর্মব্যস্ত প্রাণগুলো ধীরে ধীরে -যে যার কুলায় ফেরে;
খোলা মাঠে মানুষের আসর-অরণ্যে পশু-পাখির আসর বসে,
দুহা আসরেই তাহারা পল্লী-প্রকৃতির বন্দনা গাহে;
তসলিমা হাসান
কানাডা,০১-০১-২০২১
১ Comment
খুবই সুন্দর দু’টি কবিতা। বিশেষত “আম-কাঁঠালের নিবিড় ছায়াতলে” কবিতাটি অনন্যসাধারণ। প্রনয় ও প্রকৃতির কবিকে শুভেচ্ছা।