২০১ বার পড়া হয়েছে
টক বরই
আমীন শাহনাজ চন্দনা
সেদিন হঠাৎ নিখিলদার সাথে দেখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে। সাথে আবার এক টোল পড়া সুন্দরী রমণীও আছেন। যার চোখ জোড়া ছুঁয়ে আছে মায়াবী কাজল। হাসলেই চিবুকটা আরও তীক্ষ্ণ হচ্ছে। নিশ্চয়ই নিখিলদা সেই ধারালো চিবুকের তীক্ষ্ণতায় এতক্ষণে ঘায়েল! কিন্তু একটু অবাক হলাম, নিখিল’দার সাথে রমণী! আমার কৌতূহল বলল— যা সন্ধি, যা, তোর অনুসন্ধানী চোখ দিয়ে সার্চ করে আয়। কাছাকাছি যেতেই বললাম, আরে নিখিলদা যে! কেমন আছেন?
নিখিলদা একটু কাঁচুমাচু হয়ে, গলাটা খু্খ্ খুখ্ করে পরিষ্কার করে বললেন, এই তো ভালো আছি। তারপর একদম গুটিয়ে নিলেন নিজেকে।
সুন্দরী রমণীর সামনেই আমি একটু মৃদু হেসে বললাম, কি হলো, জিজ্ঞেস করবেন না, আমি কেমন আছি?
না পেরে নিখিলদা শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলেন, কেমন আছ সন্ধি?
খুব ভালো আছি। তারপর সুন্দরী রমণীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললাম, সাথে উনি কে?
কেউ না।
আবারও মৃদু হেসে বললাম, কেউ না মানে?
নিখিলদার মুখে ‘কেউ না’ কথাটা শুনে, সুন্দরী রমণী গাল ফুলিয়ে, নিখিলদাকে চোখ দিয়ে আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে, হন্ হন্ করে চলে গেলেন।
নিখিলদা তো ডেকেই চলেছেন, এই শোনো…, দাঁড়াও…, প্লিজ…, এই…, শোনো না…
কিন্তু হাই-হিল পরা সুন্দরী রমণী গট্ গট্ করে হেঁটে চলে গেলেন। যেতে যেতে আর ভুল করে একবারও পেছন ফিরে তাকাননি।
আহা! বেচারা নিখিলদার মুখটা তখন ছিল দেখার মতো! আমি হাসি আর থামিয়ে রাখতে পারছিলাম না। বললাম, কী, সব ভন্ডুল করে দিলাম নাকি?
তুমি না… কী যে একটা!
আমি তো এরকমই। কিন্তু আপনাকে দেখে— কথাটা শেষ করতে পারিনি, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিলাম।
আমাকে এমন হাসতে দেখে নিখিলদা বললেন, তুমি না এখনো একই রকম আছ। সেই আগের মতোই দুষ্ট।
হুম জানি তো। তবে আপনার পরিবর্তন দেখে আমি কিন্তু বেশ অবাক হয়েছি! তা উনি কি আমাদের হবু বৌদিমণি? আর যাবে কোথায়, সঙ্গে সঙ্গে নিখিলদার ফর্সা গাল লাল টুকটুকে আপেল হয়ে গেল।
দুষ্টুমি আরও চড়ে গেল আমার। জিজ্ঞেস করলাম, শেষ কবে দেখা হয়েছিল আমাদের মনে পড়ে?
একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, না। আর ওসব মনেটনে রেখে কী লাভ?
তার মানে, মনে আছে।
উনি আমার কথার একটু পাশ কাটিয়ে বললেন, আচ্ছা শোনো, আজ না আমার একটু তাড়া আছে। এক্ষুণি যেতে হবে।
যাই মানে, বললেই হলো! গুনে গুনে ছয় বছর পরে দেখা। চা, সিঙ্গাড়া না খাইয়ে, এভাবেই চলে যাবেন?
আজ না প্লিজ, অন্যকোনো দিন।
এরকম অবস্থায়, আমার মতো নাছোড়বান্দার কাছে কেউ পার পেয়ে দিব্যি চলে গেছে, এমন কখনোই হয়নি। শেষপর্যন্ত নিখিলদাকে বাধ্য করলাম। টং দোকানে চা খেতে যেতে। চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিলেন?
লুকাইনি তো। মেডিকেলেই ছিলাম। ছুটিতে অবশ্য দিদির বাসায় চলে যেতাম।
নবনীদির বাসায়?
হুম।
দিদি এখন কোথায় থাকেন?
দিদিও চট্টগ্রামেই থাকেন। জামাইবাবু ওখানেই চাকরি করেন। এজন্য আর ছুটিতে ঈশ্বরদীতে যাওয়া হতো না। যেতে চাইলে, দিদি খুব মন খারাপ করত। তাই ছুটিগুলোতে বাবা-মাই দিদির বাসায় চলে আসতেন।
ও আচ্ছা। তো আপনার এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি?
হ্যাঁ হয়েছে। চাকরির জন্য একটা ইন্টার্ভিউ দিতেই ঢাকায় এসেছি।
তাহলে ঐ সুন্দরী ললনা?
ও জামাইবাবু খুড়তুতো বোন। জামাইবাবুর একটা জিনিস ওকে দিতেই এখানে এসেছিলাম।
আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছেন না যে? সেই তখন থেকে আমি তো একা একাই বক্ বক্ করে যাচ্ছি। আমার সম্পর্কে কিছু জানতে ইচ্ছে করছে না?
কী জানতে ইচ্ছে করবে? সবই তো জানি।
আমি একটু অবাক হলাম! সত্যিই জানেন?
হুম, জানি।
একটু আশ্চর্য হয়ে বললাম, কীভাবে জানেন?
সেটা তোমার না জানলেও চলবে। তবুও বলি, ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব।
ও আচ্ছা, তাই বলি জানার কোন আগ্রহ নেই কেন! কিন্তু আমার তো এখন একটা কথা জানার জন্য মন ভীষণ উশফিশ করছে। আচ্ছা, সেদিন আপনি ওভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন কেন?
কোন দিন বলো তো?
আচ্ছা তার আগে বলেন, আপনার কী টক বরইয়ের কথা মনে আছে? বলেই আমি আবার হাসতে শুরু করলাম।
ওই টক বরই! ওরে বাবা! ওটার কথা আমি জীবনে ভুলব না।
কেন, বরই খুব টক ছিল বলে?
হুম।
আর কিছু মনে নেই?
আর কি মনে থাকবে?
তা অবশ্য ঠিক। কারণ মজাটা তো উপভোগ করেছিলাম আমি। আপনি না। তাহলে তো এখন আপনাকে সেদিনের গল্পটা শোনাতে হয়।
শোনেন বলি, নারায়ন কাকাদের বাড়ির সামনে যে বরই গাছটা ছিল না? সেদিন আমি ওই গাছটার একটা ডালে বসেছিলাম। কোচ ভর্তি করছিলাম বরই পেড়ে। আর মাঝে মাঝেই বরই খেয়ে খেয়ে, বীচিগুলো ছুঁড়ে ফেলছিলাম নিচের দিকে। আপনি তখন হেঁটে যাচ্ছিলেন ঠিক ওই বরই গাছটার তলা দিয়েই। একটা বীচি গিয়ে পড়েছিল, আপনার মাথার পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলগুলোর ওপর।
আর ওমনি আপনি গ্রীবা উঁচিয়ে, সাপের মতো ফণা তুলে, ফোঁস করে উঠে বলেছিলেন, কে রে ওখানে?
আমি তখন বরই গাছের ডালে বসে, পা দুটো দুলাতে দুলাতে ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলেছিলাম, বরই খাবেন? খুব মজা!
আপনি অদ্ভুত রকম মুখভঙ্গি করে বলেছিলেন, ওসব মেয়েলী ফল আমি খাই না।
ব্যস, অমনি আমার জেদ চেপে গেল। ফল কোনোদিন মেয়েলী হয়? বলেই গাছ থেকে এক লাফে নেমে বললাম, বিশ্বাস করেন, একটুও টক না। খুব মজা! একটা খেয়েই দেখেন।
অনেক জোরাজুরির পর, আমার কাছ থেকে একটা বরই নিয়ে কামড় দিতেই, চোখ মুখ খিঁচিয়ে বলেছিলেন, এ বাবা কী টক! কীভাবে খাও এমন টক ফল?
তখন আপনার মুখাটা যা হয়েছিল না দেখতে! আমার কাছে যদি তখন এখনকার মতো এমন স্মার্ট ফোন থাকত, বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনার মুখের ছবিটা তুলে, সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল করে দিতাম।
আমি আবার বলেছিলাম, ওই বরইটা একটু কাঁচা ছিল বোধ হয়, তাই একটু টক লেগেছে খেতে। তারপর, একটা ডাসা সাইজের বরই দিয়ে বলেছিলাম, এটা খেয়ে দেখেন, খুব মিষ্টি!
কিন্তু কে শোনে কার কথা। বিশ্বাস আর তুমি! বলেই আপনি যে ভাবে হন্ হন্ করে তীরের বেগে হেঁটে চলে গেলেন। আমি তো দেখে একেবারে হাসতে হাসতে খুন।
ওটাই ছিল আপনার সাথে আমার শেষ দেখা। তারপর থেকে আপনাকে আর কোনোদিন নারায়ন কাকাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখিনি। পরে শুনেছি, তার কিছুদিন পর নাকি, আপনি চট্টগ্রাম মেডিকেলে চান্স পেয়ে, সেখানে পড়তে চলে গেছেন। এসেছিলেন গ্রামে কয়েকবার, কিন্তু আমার সাথে আর দেখা হয়নি। তবে আপনার বিশেষ একটা বার্তা আমার হাতে ঠিকিই পৌঁছেছিল। তা এরকম বইয়ের পাতার ভাঁজে ভাঁজে, কতগুলো প্রেমপত্র লুকোনো ছিল শুনি?
কী যে বলো! বলে আবার আপেলের মতো লাল হতে শুরু করলেন।
আমি একটু টিপ্পনী কেটে বললাম, দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটা পর্যন্ত উল্টে খেতে জানেন না। আগে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকিয়ে পর্যন্ত কথা বলতে পারতেন না। তাই আজ আপনাকে ঐ সুন্দরী রমণীর সাথে এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে, আমার খুব কৌতূহল হচ্ছিল!
না না। যা ভাবছ, তেমন কিছু না। তারপর খুব কৌতূহল ভরা চোখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন— আচ্ছা, সত্যি কী তুমি আমার লেখা কোনো চিঠিটা পড়েছিলে?
হুম।
কোন চিঠিটা পড়েছিলে?
আমি আবারও অবাক হলাম! কোন চিঠিটা মানে? আপনি আমাকে কতগুলো চিঠি লিখেছিলেন? আর চিঠি এভাবে বেহাত হয় কীভাবে? আপনি কী জানেন, এই চিঠির অর্থ জানার জন্য আপনাকে আমি হন্যে হয়ে খুঁজেছি এতদিন।
বেচারা এবার একদম লাল টুকটুকে আপেল হয়ে বললেন, তোমাকে তখন ঠিক বুঝতে পারতাম না। ভয় হতো। চিঠি দিলে তুমি যদি সবাইকে বলে দাও। তারপর, আমাকে তোমার বান্ধবীদের দেখিয়ে হাসাহাসি করো। সবার সামনে আমাকে ক্ষ্যাপাও। বাবা, তোমার বান্ধবীরা যা বিচ্ছু ছিল। এসব ভেবেই, তখন সাহস করে আর কখনোই চিঠিগুলো দেওয়া হয়নি তোমাকে। কিন্তু তুমি কী করে চিঠিটা পেয়েছিলে? আমাদের বাড়ির কাউকেই তো তখন আমি আমার বই গুছাতে দিতাম না।
ওই দিন টক বরই খাওয়ার ভয়ে যখন আপনি হন্ হন্ করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বইয়ের পাতার ভাঁজ থেকে হয়ত চিঠিটা পড়ে গিয়েছিল। তখন তো আর জানতাম না, যে ওটা ছিল আমাকে লেখা চিঠি। আমি অনেকবার আপনাকে ডেকেছিলাম সেই কাগজটা দিতে। কিন্তু আমার ডাক শুনে আপনি আরও দ্রুত হেঁটে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আপনি চলে যাবার পর কাগজটা খুলে দেখে, আমি তো পুরো থ হয়ে যাই।
আমার কথাগুলো শোনার পর, নিখিলদাকে একদম নতুন বউয়ের মতো লাগছিল। ঘোমটাপরা নতুন বউয়ের চিবুকটা একটু উঁচু করে ধরে নতুন বর যেমন করে বলেন, দেখি তো তোমার চাঁদ মুখখানা একটু। আমিও ঠিক তেমন নিখিলদার চিবুক ছুঁয়ে বললাম, ভাগ্যিস, সেদিন অমন টক বরই খাইয়েছিলাম আপনাকে, নইলে আজ এমন লাল টুকটুকে আপেলদা পেতাম কী করে?
নিখিলদা লজ্জায় রাঙা হয়ে বললেন, আহ্, কী করছ? সবাই দেখছে তো। ছাড়ো।
ছাড়ব মানে, বললেই হলো? গুনে গুনে পুরো ছয় বছর অপেক্ষার পর, তবেই ফিরে পেয়েছি এমন লাল টুকটুকে আপেলদাকে। আর কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। এরপর থেকে এমন লাল টুকটুকে আপেলদাকে সবসময় আমার নজরবন্ধি করে রাখতাম। কখনই চোখের আড়াল হতে দিতাম না। ও হ্যাঁ, আর ওই সুন্দরী ললনাকেও কিন্তু আর কখনই ভিড়তে দেইনি আপেলদার আশেপাশে। পরে অবশ্য আপেলদা আর আপেলদা থাকেনি। দা টুকু ছেঁটে, সারাজীবনের জন্য আমার কয়েদী হয়েছিল।
২৭ ডিসেম্বর , ২০১৯
মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র
২ Comments
congratulations.
ভালো লাগলো