১৯৮ বার পড়া হয়েছে
ঝুমার জীবনের গল্প
[ফারজানা ইয়াসমিন]
[ফারজানা ইয়াসমিন]
আমার শশুর বাড়ির পাশের বাড়ির মেয়ে ঝুমা।মেয়েটাকে খুব ভালো লাগে আমার। মায়াও লাগে।আমাদের মেয়েদের ভাগ্য অনেক সময় অদ্ভুত হয়।মেয়েটার বিয়ের পর চার বছর পর্যন্ত কোন সন্তান হয়নি। শশুর শাশুড়ি বাড়ির সবাই সবসময়ই তার দোষ দিয়েছে। মেয়েটা নীরবে নিভৃতে কাঁদে আর দোয়া করে আল্লাহর কাছে। অনেক অত্যাচার সহ্য করে সেখানে। শেষ অবধি আর পারে না সেই সংসারে থাকতে। ঝুমার পরিবার নিয়ে আসে তাকে।ডিভোর্স হয়ে যায় তার।
মেয়েটা সবকিছু ছেড়ে চলে আসার পর তার মনে অবশ্যই কষ্ট লেগেছে। একটা মেয়ে খুব সহজে সংসার ছেড়ে চলে আসে না।কিন্তু মানুষ তা বুঝতে চায় না।সব দোষ মেয়েদের কাঁধে দিয়ে দায় সারে।আমি যখনই বাড়িতে যেতাম দেখা হতো ঝুমার সাথে। কথা হতো অল্প সময়ের জন্য। 

সবচেয়ে আমার কাছে খারাপ লাগতো যেটা।আমার শাশুড়ি ঝুমার শশুর বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতো।এটা আমার কাছে কাঁচা ঘায়ে লবণ দেওয়ার মতোই মনে হতো।অনেকবার আম্মাকে বলেছি, ঝুমা আসলে ওর পুরনো দিন নিয়ে কিছু বলবেন না।এতে ওর কাছে কষ্ট লাগে।ও হয়তো সবকিছু ভুলে নতুন করে শুরু করতে চায়।মনে করিয়ে দিলে খারাপ লাগে।আম্মা বলতেন,আরে না।খবর নেই। আমার আসলে এমন অযাচিত সাহায্য গুলো বা খবর নেওয়া একদম পছন্দ না।
সত্যি বলতে আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা আমাদের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করায় না।আমরা একটা দুঃস্বপ্নের জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে বাঁচতে চাইলেও কিছু মানুষ পিছন থেকে টেনে ধরে।আম্মা হয়তো জিজ্ঞেস করে। কিন্তু অনেক মানুষ আছে খোঁচা মারে কথায় কথায়।আর তাদের মুখ বন্ধও করা যায় না। অনেক সময় শুধু মাত্র এইসব কারণে বাবা মা মেয়েদেরকে অশান্তির মধ্যে ফেলে রাখে।মনে করে তাদের সম্মান নষ্ট হবে। মানুষ নানান কথা বলবে।ছোট ভাই বোন থাকলে তাদের আর ভালো বিয়ে হবে না।তখন ঐ মেয়েদের সবকিছু সহ্য করতে বলে।মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে বলে সেই সংসারে।
কিন্তু ঝুমার ভাগ্য অনেক ভালো। শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে না হলেও তার বাবা মায়ের কাছে তাদের মেয়ের মূল্য অনেক বেশি। অনেক শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরাও এতোটা সহানুভূতি পায় না পরিবার থেকে। অনেক শিক্ষিত এমন কি চাকরিজীবি নারীও সবকিছু সহ্য করে জীবন চালিয়ে যায়।

ঝুমার প্রাক্তন স্বামী আবারও বিয়ে করে। কিন্তু সেই স্বামীর সন্তান হয়নি।ঝুমার আসলে কোনো সমস্যা ছিল না। ঝুমার ডিভোর্সের দুই বছর পর ঝুমাকে আবারও বিয়ে দেয় তার পরিবার। ছেলে বিদেশে চাকরি করে। ভাগ্য ভালো এবার ঝুমার।বিয়ের দুই মাসের মধ্যেই ঝুমা প্রেগন্যান্ট হয়।এতে খুশিতে আত্মহারা সবাই। ঝুমার বিয়ের চার মাস পর ঝুমার স্বামী রনি বিদেশে চলে যায়।
কিন্তু এবারেও কপাল খারাপ ঝুমার।স্বামী চলে যাওয়ার পর ঝুমার শশুর বাড়িতে শাশুড়ি নানান ধরনের ঝামেলা শুরু করে। এটার কারণ হলো ঝুমার বিয়ের সময় ঝুমার জামাইকে কিছু জমি দেওয়ার কথা বলা হয় ঝুমার বাড়ি থেকে। কিন্তু বিয়ের পর নানান সমস্যা দেখে ঝুমার বাবা রনির নামে জমি দিতে রাজি হয় না।সে তার মেয়ে ঝুমার নামে জমি লিখে দিতে চায়।কারণ বলা তো যায় না। ভবিষ্যতে যদি রনি ঝুমার সাথে খারাপ কিছু করে। তাহলে ঝুমার কী হবে?
যখন ঝুমার শশুর বাড়ির সবাই বুঝতে পারলো।ঝুমার বাবা কিছুতেই জমি রনির নামে দিবে না। তখন ঝুমার শশুর বাড়িতে শাশুড়ি নানান বাজে কথা বলা শুরু করে।ঝুমা সহ্য করতে না পেরে চলে আসে বাবার বাড়িতে স্বামীর ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা
করে। রিন দেশে আসলেও জমি না পাওয়ার জন্য ঝুমাকে ডিভোর্স দেয়।রনি কোর্টে বাচ্চার সব খরচ দিতে চাইলেও।পরে আর কিছুই দিত না।
ঝুমা আবারও ফিরে আসে বাবার বাড়িতে। কিন্তু আমি ঝুমাকে তার ছেলের সাথে অনেক খুশি দেখেছি। সন্তানের সাথে মায়ের সম্পর্ক সত্যি অন্য রকম। মায়ের শক্তি আর সাহস অনেক বেড়ে যায় যখন তার বুকে তার সন্তান থাকে।আশেপাশের মানুষের কথা আরও বেড়ে যায়। ঝুমা এসব শুনে কষ্ট পেলেও সে কারো সামনে কাঁদে না।
ঝুমা আমাদের বাড়িতে আসলে আম্মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতো রনির কথা। ঝুমা সোজাসাপ্টা জবাব দিত। আমার ওর জবাব ভালো লাগতো।সে রনির আশা করে না।তার সন্তান সে একা মানুষ করবে। মেয়েটার বয়স অনেক কম।এই সমাজে এমন একটা মেয়ে একা থাকাও অনেক কষ্টের।
হঠাৎ একদিন ঝুমার বাবার বুকে ব্যাথা শুরু হয়।সবাই ভয় পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ঢাকায় নেওয়া হয়।আম্মা আমার হাসবেন্ডকে ফোন করে বলে দিলেন ঝুমার বাবা অসুস্থ। ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। তুমি খোঁজ নিও।কিছু লাগলে সাহায্য করো।তোমার বাসার কাছে হাসপাতালে নিচ্ছে। দরকার হলে তোমার বাসায় যেন যায় তারা।আমি তখন শশুর বাড়িতে। আমার শাশুড়ির এই একটা গুণ আমার ভালো লাগে।

ঝুমা আমাদের বাড়িতে এসে কান্নাকাটি করছিল।আর বলছিল,আব্বা যাওয়ার সময় আমার হাত ধরে বারবার কাঁদে আর বলে,মা গো তোমার জন্য কিছু করতে পারলাম না।তোমার বাবাকে ক্ষমা করে দিও।তবে ঝুমার বাবার সেই ব্যাথা গ্যাস্টিকের ব্যাথা ছিল। সত্যি যদি সেদিন কিছু হতো।ঝুমার জন্য অনেক কঠিন হতো বাচ্চাকে নিয়ে টিকে থাকা। কারণ তার ছোট দুই ভাইয়েরও বিয়ে হয়েছে। যদি ভাইরা আগের মতো না দেখে?
কয়েকমাস পরে গিয়ে শুনি ঝুমা গার্মেন্টসে চাকরি করে। ঝুমার ছেলে আগমী বছর স্কুলে যাবে।ঝুমা তার স্বপ্ন এখন ছেলেকে নিয়ে সাজায়।ঝুমা যা পেরেছে আমাদের সমাজের অনেক মেয়ে তা পারে না। শুধু মাত্র পরিবারের সহযোগিতা পায় না বলে।
কিছু দিন আগে আমার শাশুড়ি আম্মা এসে বলেন, ঝুমার জন্য একটা পাত্র দেখেছি। লোকটার বয়স একটু বেশি। আগে একটা বিয়ে হয়েছিল। ঐ বউয়ের সাথে তালাক হয়েছে অনেক আগেই।আমি ভাবলাম আমাদের সমাজ মেয়েদেরকে একার মতো করে কেন থাকতে দেয় না? একটা মেয়ে কেন নিজের ইচ্ছা মতো একা থাকতে পারে না?
কিন্তু ঝুমা এখন তার ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। যে স্বপ্ন শুধুই সামনে এগিয়ে চলার।
ঝুমাকে দেখে মনে হলো বলি,সাবাস ঝুমা।এমনই শক্ত হতে হবে মেয়েদের। ঝুমার বাবা মায়ের মতো এমন সাহসী বাবা মা কমই আছে আমাদের চারপাশে। কারণ আমরা সবাই মিথ্যা সম্মানের জন্য মেয়েদের কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দেই।মেয়েদেরকে দূর্বল মনে করি।আমি যখনই ঝুমা আর তার বাবাকে দেখি আমার মনটা শীতল হয়ে যায়। আমাদের শিক্ষিত সমাজেও এমন মানুষ কম আছে। এতো ঝড় বয়ে গেল।অথচ ঝুমা এখনো বুকে সাহস নিয়ে টিকে আছে। আমি মন থেকে ওর জন্য দোয়া করি।সে যেন তার ছেলেকে নিয়ে সুন্দর একটা জীবন গড়তে পারে।ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারে।জীবনের সাথে কোনো সমঝোতা না করে।
ঝুমার জীবনের গল্প আমাদের সমাজে নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। এতো ঝড় উপেক্ষা করে ঝুমা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তার জীবনে ছেলেকে নিয়ে। এই যুদ্ধে ঝুমা যেন জিতে যায়। এতো অপেক্ষার পর সে তার সন্তানকে বুকে পেয়েছে। বর্তমানে মেয়েরা শিক্ষিত না হলেও কোনো না কোনো ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করছে।জীবনের কঠিন বেড়াজাল থেকে বের হয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।
পরিবার আর সমাজের সকল প্রতিকূলতা ডিঙিয়েও এমন করে ঝুমার মতো অসংখ্য মেয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।তাদের সাহস আরও বেশি হবে যদি আমরা তাদেরকে পিছিয়ে না দিয়ে সামনে যেতে উৎসাহ দিয়ে থাকি।
১ Comment
congratulation