২২০ বার পড়া হয়েছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
জোয়াল
সেলিম ইসলাম খান
পর্ব: এক
সাদা ষাঁড়ের গুঁতোয় লাল ষাঁড়টির কপাল ফেঁড়ে যখন রক্তের লালিমায় চেয়ে গেল তখন দর্শকদের মধ্যে উল্লাস শুরু হল। কেউ ঢোল বাজাচ্ছে, কেউ কাঁসার থালা। শিশুরা ঘড়ার মুখে চামড়া বেঁধে বাজাচ্ছে। কেউবা আবার পাটিপাতার বাঁশি বাজাচ্ছে। সাদা ষাঁড়ের মালিক কৃষক আবছার মিয়া কোমরের গামছা খুলে মাথায় বাঁধল। সে তার প্রিয় ষাঁড় দুধরাজের মাথায় ও গলায় হাত বুলিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগল। আর লাল ষাঁড়ের মালিক মাতব্বর আবুল খায়ের রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ময়দান ত্যাগ করলেন।
পূর্ব বঙ্গের উপকূলীয় সোনার চরে আজ উৎসবের আমেজ। হাজার হাজার মানুষ আজ জড়ো হয়েছে জঙ্গলের ধারের ধানভাঙ্গা মাঠে। শীতের শুরুতে এখানে প্রতিবছরই উৎসব হয়। এই উৎসব ষাঁড়ের লড়াই। এলাকার তিনটি ষাঁড়ের পাশাপাশি দূরদুরান্ত থেকে এসেছে আরো নয়টি ষাঁড়। সেসব জায়গা থেকেও এসেছে বিস্তর মানুষ। ঢোল আর বাঁশীর শব্দে পুরো এলাকা গমগম করছে। এরই মাঝে কিছুলোক মোয়া, বাতাসার দোকান খুলে বসেছে। কেউবা মাঠা আর রসকদম্ব বিক্রি করছে। কয়েকটি কুমার পরিবার এই মেলার সুযোগে হাড়িপাতিল আর টেপা পুতুল নিয়ে এসেছে বিক্রি করবে বলে।
সকাল থেকে একটানা ষাঁড়ের লড়াইয়ের পর শেষ বিকেলে চূড়ান্ত লড়াই হয়ে গেল। সে লড়াইয়ে ছাপোষা কৃষক আবছারের ষাঁড়ের বিজয়ে মাতবরের অনুসারীরা রাগে হুলুস্থুলু বাঁধিয়ে দিল। তারা কাউকে কিছু বলতে না পেরে পরাজিত ও আহত ষাঁড়টিকে বেদম লাঠি পেটা করতে শুরু করল। ষাঁড়টিও গেল ক্ষেপে। এতক্ষণ জাতভাইয়ের সাথে লড়াই করে হেরে সে যতটা না লজ্জিত ছিল, এখন মালিকপক্ষের প্রহারে সে ততধিক বিদ্রোহী হয়ে উঠল। চারদিকে যাকে পেল সর্বশক্তি দিয়ে সে তাকেই আঘাত করল। বিশেষ করে কুমারের সর্বনাশ হল বেশি। তার হাঁড়ি-পাতিল, টেপাপুতুল কিছুই আর আস্ত রইল না। বেচারা হাড়জিরজিরে বুড়ো কুমার আর তার ছেলেরা কেঁদে বুক ভাসল। কিন্তু সেদিকে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই ষাঁড়ের গুঁতোর ভয়ে পড়িমড়ি করে পালাচ্ছে।

এদিকে আবছারের বাড়িতে আজ খুশির ধুম পড়েছে। তার ষাঁড়ের বিজয়ে শুধু নয়, গ্রামবাসী অত্যাচারী মাতবরের ষাঁড়ের পরাজয়েই বেশি খুশি। তাই তারা এই বিজয়ে আবছারের বাড়ির উঠানে নেচে-গেয়ে দারুণ উৎসব শুরু করল। আবছারের বউ আখের চিনির শরবত আর একটাকা সিকের পয়সার মত অরিয়েন্টাল বিস্কুট দিয়ে খুশি মনে সবাইকে আপ্যায়ন করছে। গ্রামের শিশুরাও আনন্দে উঠানে নাচানাচি করছে। ঈদ-কোরবান ছাড়া এমন উপলক্ষ্য এই চরাঞ্চলের নিরন্ন মানুষের ভাগ্যে এমন উৎসব আর জোটে না। বছরে দু’একটা বিয়ে হয়, তাও অনেকটা চুপিসারে। ছেলেমেয়ের বিয়েতে পুরো গ্রাম দাওয়াত করে খাওয়াবেন, এমন মানুষ এই চরাঞ্চলে সত্যই বিরল।
রাত পেরুলেই ভোর। কৃষক আবছার মিয়া রোজকার মত গোয়ালে গিয়ে ষাঁড়কে নিয়ে যাবে মাঠে। কিন্তু একী হল, তার ষাঁড়ের। কাল সে বিজয়ীর বেশে গোয়াল ঘরে ঢুকল। অথচ আজ সে মরার মত শুয়ে আছে!
আবছার মিয়া ষাঁড়ের মুখের কাছে যেতেই চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তার প্রিয় দুধরাজ তাকে ছেড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আবছার মিয়ার চিৎকারে বাড়ির সকলে, এমনকি আশপাশের বাড়ি থেকেও সকলে এসে হাজির। সবাই দুধরাজের হঠাৎ মৃত্যুতে শোকে আচ্ছন্ন। আবছার মিয়া সামনে কিছু ধুতুরার পাতা আর কিছু অজানা বনজপাতা পড়ে থাকতে দেখল। সেগুলো হাতে তুলে সবাইকে দেখিয়ে সে আহাজারি করতে লাগল। ওরে আমার দুধরাজ এম্নি এম্নি মরেনিরে! তাকে শত্তুররা মেরে ফেলেছে। তার জিত শত্তুর হিংসা বাড়িয়েছিলরে। তাই তারা ধুতুরার বিষ খাইয়ে আমার দুধরাজকে মেরে ফেললরে।
আবঝারের বিবি রহিমা বেগমও বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি করে কাঁদছেন,ওরে আমার দুধরাজরে! তুই কোথায় গেলিরে? তোরে কোন শত্তুর মারলরে? এসব বলে তিনি আহাজারি করছেন। আবছারের ছেলে আরমান গোমড়ামুখ নিয়ে পুকুর গাটে বসে আছে। আর বন্ধুদের বলছে, এটা ঐ মাতবরের কারসাজি। সে রাত্তিরে লোক পাঠিয়ে আমাদের দুধরাজকে বিষ খাইয়েছে। এই অবলা জীবটাকে মারতে তার একটুও খারাপ লাগেনি।
বন্ধুরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। নূরছাফা বলছে, এই তল্লাটে মাতবরের সাথে লড়াই করে কেউ কি পারে! কেন তুই শুধু শুধু ষাঁড়ের লড়াইয়ে দুধরাজের নামটা দিলি! তার জিত না হলে সে এখনো বেঁচে থাকত।
আবুল হোসন বলল, তুই থামতো ছাফা! মাতবরের জন্য আমাদের দুনিয়াদারী ছেড়ে দিতে হবে? সে যা ইচ্ছা তাই করবে? আমি বলছি কি আরমান, তুই একবার থানায় যা। পুলিশকে সবকিছু বল। তারা এর বিচার করবে।
রহিম বলল, তুই পাগল হলি আবুল। মাতবর পুলিশরে টাকা খাইয়ে বিচার ধামাচাপা দিবে। তার উপর আরমানদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে সর্বশান্ত করে ছাড়বে। তারচেয়ে বরং চুপ থাকাই ভাল। শেষে আমও যাবে, চালাও যাবে। এই তল্লাটে মাতবরের সাথে কখন কে পেরে উঠেছে!
বশর বলল, রহিম ঠিকেই কইছে। মাতবরের সাথে লাগলে সে কলাকৌশল করে ভিটেমাটিও দখলে নেয়, বংশও নির্বংশ করে দেয়। আমি বলি কি মাথা গরম না করে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা কর, কোনটা করলে ভাল হয়!