১৭০ বার পড়া হয়েছে
স্বামী
[তাহ্ মিনা নিশা]
আমার নাম রেখা। আমরা নয় ভাইবোন।যেই বছর আমার পাঁচ নম্বর ভাইটার জন্ম হলো সেই বছরই আব্বা আম্মা আমাকে নানা নানীর কাছে পাঠিয়ে দিল। আমি তাই নানা বাড়ীতে মামা খালাদের সাথে মানুষ হয়েছি।আমার আম্মা নানা নানীর বড় সন্তান। অতিরিক্ত সুন্দরী ছিল বলে আমার আব্বা আমার আম্মাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল।সে এক বিশ্রী ইতিহাস!
আব্বা তেমন কিছু করতো না, মানে আয় উপার্জন ছিল না বললেই চলে। তার বিয়ের আগে পাড়ার মোড়ে মোড়ে গুন্ডামী, মাস্তানী, চাঁদাবাজী করে দিন কাটাতো।আমার দাদার হোটেলে খেতো আর নেশা করে বেড়াতো। এমনি একদিন আম্মাকে স্কুলে যেতে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায় আমার আব্বা। দুই তিন সপ্তাহেই আম্মার জন্যে পাগল প্রায় অবস্থা হয়ে যায় তার। কিন্তু নানাদের অবস্থার কথা জেনে প্রস্তাব দিতে সাহস করেনি সে সময়।দাদা বাড়ীতেও আম্মার ব্যাপারে বলেনি কিছুই। পরবর্তীতে আব্বার বন্ধুদের সহযোগীতায় একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে আম্মাকে তুলে নিয়ে যায় আব্বা। এক সপ্তাহ আব্বা আম্মাকে নিয়ে হোটেলে থাকে। এই আশা নিয়ে যে, এতদিন বাইরে রাত কাটানো মেয়েকে তার বাবা মা কলঙ্কের ভয়ে ঘরে তুলবে না। আর সেই সুযোগে আব্বা আম্মাকে নিয়ে দাদার বাড়ীতে উঠবে…এটাই তার প্লান । প্লান অনুযায়ী হোটেলে থাকার পর অবশেষে টাকায় টান পড়লে আব্বা আম্মাকে নিয়ে আমার দাদা বাড়ীতে ফিরে আসে।
দাদা দাদী আব্বার কুকর্মের জন্যে বাড়ীতে আশ্রয় দেয় না। তবে আম্মাকে যদি তার বাপের বাড়ীতে রেখে আসতে পারে তবে তারা শুধুই আব্বাকে আশ্রয় দিবে বলে জানায়। আব্বা কিছুতেই মাকে ছেড়ে দেয়ার এই প্রস্তাবে রাজি হয় না।তারপরেও আম্মাকে নিয়ে আমার নানার বাড়ীতে যায় দেখা করার জন্যে। নানা নানীর কাছে মাফ চায়, কিন্তু নানা নানীও আমার আম্মাকে আর ঘরে তুলে নেয় না। আম্মার কোনো অপরাধ নেই জেনেও তারা তাদের মেয়েকে মেয়ে বলে পরিচয় দিতে অস্বীকার করে। বাড়ী থেকে আমার আব্বাকে ঘাড় ধরে বের করে দেয় নানার ছোটভাই। ব্যাস্ সেই যে আব্বা আম্মা আমার নানার ও দাদার বাড়ী ছেড়েছে আর তারা এমুখো হয়নি।
সেই সময়— আমার নানীর সাথে যখন আম্মার শেষ দেখা হয়েছিল, আম্মাকে একটা চেইন ও একজোড়ো স্বর্নের কানের বাউটি পরিয়ে বিদায় দিয়েছিল।সেটা অবশ্য আমার নানা জানতো না।যায় হোক, আব্বা আমার আম্মার গলার সেই চেইন ও কানের দুল বিক্রয় করে অন্য শহরে গিয়ে ট্রেন ষ্টেশনে একটা পান বিড়ির দোকান দেয়। সেই দোকান থেকে আস্তে আস্তে একটা মুদিখানা হয়, তারপর সেটাকে আরেকটু বড় করে আব্বা পাশে ষ্টেশনারী দোকানও বানিয়ে ফেলে। দোকানে ভালোই ব্যবসা হতে থাকে। আমরা পাচঁ ভাইবোন হই। একদিন নানা নানী আমাদের বাড়ীতে এসে সাত বছরের আমাকে তাদের কাছে নিয়ে রাখতে চাইলে আব্বা আর অমত করেনি। সেই থেকে আমি নানার বাড়ীতে। আব্বা কখনো খোঁজ খবরও নিতো না আমার। লোকের মুখে শুনেছি আব্বা নাকি বলতো,
—“তার মেয়েকে আমি নিয়েছি, বিনিময়ে আমার মেয়েকে শর্ত ত্যাগ করে দিয়েছি।”
আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠি তখন একদিন আমার দাদা দাদী গিয়ে আমাকে তাদের কাছে নিয়ে আসে।দাদার কথা,
—আমার বংশের নাতনী যার তার ঘরে থাকতে পারে না।”
নানাও এমন কথা শুনে মেজাজ খারাপ করে আমাকে বিদায় দেয়। আমি দাদার বাড়ীতে আসতে না আসতেই আমার চাচাতো ছোট বোনের প্রাইভেট টিচারের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে।
প্রথমদিকে তার কথাগুলো আমার খুব ভালো লাগতো। ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ। সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে।ইন্টারমিডিয়েট পাশ, পয়সার অভাবে ভালো ছাত্র হওয়া সত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে নাই। টিউশনি করে যে কয়টা টাকা পায় তা দিয়ে মেসে থাকে,খায়, বাড়ীতে বাবা মাকে টাকা পাঠায়।আমি দাদা বাড়ীতে ভালো কিছু রান্না হলে তার জন্যে লুকিয়ে তুলে রাখি। সময় সুযোগ বুঝে তাকে গোপনে খেতে দেই। আবার মাঝে মধ্যে শুকনো জিনিস হলে কাগজে মুড়ে দিয়ে দেই।মাত্র ছয় মাসের মাথায় আমরা ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই সেই অবুঝ বয়সে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি।
মাহফুজ মেস ছেড়ে বস্তিতে একটা বাসা ভাড়া নিলে আমরা সেখানে গিয়ে উঠি।সকাল বেলা থেকেই মাহফুজের টিউশন শুরু হয় আর আমি একা একা একটা ঘরে থাকি।দুই তিন দিন পর ঘরে একা একা দম বন্ধ হয়ে গেলে আমি বাইরে বের হয়ে আশেপাশের সবার সাথে কথাবার্তা বলি। তখনই সিদ্ধান্ত নেই, আমিও ইনকাম করবো, মানুষের বাড়ীতে কাজ করবো। প্রথম দিকে মাহফুজকে না জানিয়েই চারটা বাসায় কাজ নেই। মাস গেলে ভালো ইনকাম হয়, হাতে পয়সা থাকলে আলাদা একটা জোর পাওয়া যায়। একদিন মাহাফুজ আমাকে দেখে ফেলে একটা ফ্লাট থেকে বের হতে। আমি তো ভয়ে গুটিয়ে যাই, না জানি কি হেস্তন্যাস্ত হয়ে যায় সেই ভয়ে।কিন্তু কি আশ্চর্য মাহফুজ আমাকে কিছুই বলে না। বরং সে আমাকে উৎসাহ দিয়ে বলে,
—-“কোনো কাজই ছোট নয়, তুমি পরিশ্রম করে উপার্জন করছো, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইছো, এটা তো খুবই ভালো কথা।তবে আমি যেমন তোমাকে সব কথা বলি, তোমারো উচিত আমাকে বিশ্বাস করে সব কথা বলা, তাতে তোমার ও আমার মধ্যের সম্পর্ক আরো শক্ত হবে।”
আমি মাহফুজের কথা শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না, তার কাছে মাফ চাইলাম,তাকে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।আর প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনো এমন হবে না।
আমি এখন পাঁচটি বাসায় কাজ করি।বিকেলে বাসায় ফিরে আমার আশেপাশের ছোট বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাই।আমার আর নিজের লেখাপড়া না হলেও অন্যদের আমি পড়তে উৎসাহিত করি। আমার মতো ভুল যেন কেউ না করে বস্তির মেয়েদের সেই কথা বলি। আমার আব্বার এক কাঁচাবয়সী ভুলের জন্যে আমাদের সকলকে বিরাট মাসুল দিতে হয়েছিল। কিন্তু স্বামী হিসেবে সে সব সময় আমার মায়ের পাশেই ছিল।আমার স্বামীও আমার পরিশ্রমের মূল্যায়ন করে।নারী হিসেবে আমাকে আত্মনির্ভরশীল হতে অনুপ্রেরণা দেয়।
আমাদের একটি পুত্র সন্তান আছে, স্কুলে পড়ে।আমরা আমাদের সকল আত্মীয় স্বজনের সাথে আস্তে আস্তে সম্পর্ক ঠিক রেখে সংসার করছি। টিনের বাড়ী ছেড়ে পাকা বাড়ীতে ভাড়া থাকছি।মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্যে তার স্বামীর অবদান অস্বীকার করলে চলবে না। কাজের কোনো ছোট বড় নেই, সব কাজকেই কাজ হিসেবে দেখি আমরা দু’জন। আমার স্বামী আমার পাশে আছে বলেই আজ আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।
সমাপ্ত
রচনাকাল—২৪/৪/২০২০
১ Comment
Good.