২৫২ বার পড়া হয়েছে
এক কৌটা দুধের জন্য
হুমায়ুন কবির
আমি দূর থেকে লক্ষ করছি ছোট চাচা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন কর্মচারী দোকান খুলে ভেতরে-বাইরে ঝাড়ু দিচ্ছে। ভাবলাম, এত সকালে আসাটা বোধ হয় ঠিক হয়নি! যাত্রাতেই আমি তার সামনে গেলে তিনি রাগ করতে পারেন ! কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে যাত্রা-অযাত্রা একদম গৌণ! তবু প্রায় পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর ধীরে ধীরে দোকানের দিকে রওনা হই। সামনে গিয়ে ভেতরে না ঢুকে চাচাকে সালাম করি। সালামের জবাব না দিয়ে তিনি কঠিনদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি অস্বস্তিবোধ করি। মিনিট খানেক পর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দোকান খুলতে না-খুলতেই কেন এসেছিস? কী প্রয়োজন? হতভাগা! আজ আমার যাত্রা অশুভ। বেচা-কেনা লাটে উঠবে!আমি যা ভেবেছি তাই হলো! চাচার এমন রূঢ় আচরণ আমি আশা করিনি! কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমাকে নীরব দেখে তিনি এবার গর্জে ওঠেন, অখাদ্য! এভাবে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কিছু বললে ভেতরে এসে বল?
আমার দেড় বছরের শিশুপুত্রের দুধ ফুরিয়ে গিয়েছে। দুধ না পেয়ে ক্ষুধায় সে অনবরত কান্না করছে। দুই দিন ধরে এ অবস্থা। তার মায়ের বুকের দুধ অপর্যাপ্ত। সে নিজেও অপুষ্টিতে ভুগছে। দুধ কোত্থেকে আসবে? এলাকায় কেউ আমাকে বাকি দেয় না। বাকি নিলে টাকা শোধ করতে অনেক দিন সময় লাগে। তাই কারো কাছে বাকি চাইতে পারি না! আমার স্ত্রী বারবার বলছে, তোমার চাচার দোকান থেকে একটা দুধ বাকি নিয়ে আস। সারাক্ষণ বাচ্চার কান্না আর সহ্য হয় না!
চাচার দোকান থানা সদরে। তিনি চাচিকে নিয়ে ওখানে বাসা করে থাকেন। তিন মাইল হেঁটে স্টেশনে যেতে হবে। ওখান থেকে ট্রেনে চেপে দুটি স্টেশন পার হয়ে থানা সদরে যেতে হয়। ঘরে পর্যাপ্ত আটা নেই। যা ছিল অনেক কসরত করে ছোট বোন মিমি খুব ভোরে দুটি রুটি তৈরি করে। মিমি আমাকে বলল, ভাইয়া, তুমি তো দূরে যাবে -একটা রুটি তুমি খেয়ে নাও, আরেকটা ভাবিকে দেব। আমি বললাম তাহলে তুই কী খাবি? সে বলল, কিছু পরে আমি তো ভাত খাব। আমার কিছু খাওয়া লাগবে না। তা হয় নারে মিমি! আমি অর্ধেক খেয়ে নিই, বাকি অর্ধেক তুই খেয়ে নে মিমি। বোনটা অনেক জোরাজোরি করে পুরো রুটি আমাকে খাওয়ার জন্য। আমার বোন উপোস করবে আর আমি একটা রুটি পুরো খেয়ে নেব, এটা তো কস্মিনকালেও সম্ভব নয়!
আমি স্টেশনের উদ্দেশে রওনা হই। পকেটে ছিল মাত্র দুই টাকা। আসা-যাওয়ার ভাড়া দুই টাকা। আমার কাছে আর কিছুই নেই। মিমির কাছে আট আনা ছিল। সে আমাকে আট আনা দিয়ে দেয়। স্টেশনে এসে আমি টিকিট কেটে বসে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন আসে। আমি ট্রেনে উঠে ত্রিশ মিনিট পরে থানা স্টেশনে নেমে পড়ি।
চাচার কথায় আমি ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকি। তার সামনে বসতে আমার খুব সংকোচ। তিনি বললেন, দাঁড়িয়ে আছস কেন হাঁদারাম? আমি ইতস্তত করতে করতে বসি। বসার পরে তিনি আবারও কঠিনভাবে বললেন, এত সকালে কেন এসেছিস হতভাগা? আমি বিনয়ের সাথে বললাম, চাচা, আপনার দেড় বছর বয়সী নাতিটার দুধ শেষ হয়ে গেছে। আপনাদের বউমারও বুকে দুধ নেই। বাচ্চাটা সারাক্ষণ কান্না করে। বাকিতে একটা দুধ নিতে এসেছি চাচা-একটা দুধ দিন চাচা। আমার কথা শুনে চাচা ক্ষেপে উঠলেন-এই ব্যাটা, আমার কিসের নাতি, তোর বাবার নাতি। আমার নাতি হবে আমার ছেলের সন্তান। বুঝলি? আমি বললাম, জ্বি। চাচা আবার ক্ষেপলেন! শোন হতচ্ছাড়া, বাবা ভাত পায় না – পোলায় করলাভাজি খায়! বুঝলি? আমি আবারও বললাম জ্বি। মিনমিন করে আবারও বললাম, চাচা, একটা দুধ দিন, এক সপ্তাহের মধ্যে টাকাটা নিয়ে আসব। নবাবজাদা, এক সপ্তাহের মধ্যে তুই কীভাবে টাকা দিবি? আমারে বোকা ভেবেছিস? আমি বললাম, না চাচা, ওটা কেন ভাবব। আপনি তো ছোট চাচা। বাপের সমান!
চাচা নিরুত্তর! দোকানে ক্রমশ বেচাকেনা বাড়ছে খরিদ্দার বাড়ছে। আমি বুঝতে পারছি তিনি আমাকে দুধ দেবেন না। বরং আরও ক্ষেপতে পারেন। আমি বের হওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসতেই তিনি বললেন, শোন, একটা বুদ্ধি বের করতেছি। আমি কিছু আশ্বস্ত হই। বললাম চাচা, বলুন। তিনি বললেন, আরে গাধা, ফর্মুলা নিয়ে মাথায় কাজ করছি। দুই মিনিট অপেক্ষা কর। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। কয়েক সেকেন্ড পরে চাচা উৎফুল্ল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, পেয়েছি। জ্বি, বলুন চাচা।
শোন, সকালে তো পান্তাভাত খাস? চাচার কথায় কী বলব, চিন্তায় পড়ি। অনেক সময় রাতে উপোস থাকতে হয়। কখনও কখনও রাতে দুইজনের ভাত ভাগ করে তিনজনকে খেতে হয়। সুতরাং পান্তা কই পাব? তবু বললাম জ্বি। এবার তিনি বললেন, পান্তাভাত পানিসহ ভালো করে পিষে নিবি। একটু চিনি দিবি। সাথে আরেকটু পানি দিয়ে ভালো করে ঝাঁকিয়ে বোতলে পুরে ওর মুখে দিবি। এতে ওর ক্ষুধাও মিটবে আর দ্রুত সে হৃষ্টপুষ্ট হবে। বুঝলি? ফর্মুলা খুব ভালো না?
আমার বাবার আদরের ছোট ভাই, আমার শ্রদ্বেয় ছোট চাচার ফর্মুলা শুনে আমি হতবাক! স্তম্ভিত! আমার চোখ ফেটে পানি বের হওয়ার উপক্রম! নিজেকে কোনো রকমে সংবরণ করে অন্য দিকে ফিরে বলি, চাচা, আসি। দরজা বরাবর আসলে তিনি ডাক দেন, শোন, আমি দাঁড়াই। তার দিকে তাকাই। এবার তিনি বললেন, ফর্মুলা কি তোর পছন্দ হয়নি? জ্বি হয়েছে বলে বের হতে উদ্যত হই। আবার তিনি বললেন, ক্ষুধা লাগছে? অর্ধেক রুটি খেয়ে সেই সাতসকালে বের হয়েছি। ক্ষুধা না পাওয়ার তো কোনো কারণ নেই। ক্ষুধার তাড়নায় মনে হয় নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে যাবে, অবস্থা এমনই! তবু বললাম, না, ক্ষুধা লাগেনি। এবার তিনি ক্যাশবাক্সে হাত দিয়ে কিছু বের করে বললেন, নে,এখানে দুই আনা আছে। এক আনায় একটা বেলা বিস্কুট খাবি আর এক আনায় একটা চা খাবি। বুঝলি।
ফর্মুলা কাজে লাগাবি।আমার পা যেন অবশ হয়ে গেছে। আমি কোনোভাবে পা টেনে স্টেশনের দিকে হাঁটছি। হঠাৎ মাথায় একটা চক্কর দেয়। মনে হচ্ছিল দুনিয়া আমাকে নিয়ে ঘুরছে! সামনে ফোনের একটা খাম্বা ছিল। আমি খাম্বা ধরে বসে পড়ি। চোখে অমাবস্যার আঁধার নেমে আসে। আমার এমন অবস্থা দেখে একজন পথচারী নিকটে এসে বলল, আপনি মনে হয় ঘুরে পড়েছেন? আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ি। তিনিসহ আরও একজন আমাকে ধরে তুলে একটা দোকানে নিয়ে বেঞ্চে শুইয়ে দেয়। মুখে-মাথায় পানি ছিটিয়ে দেয়। আমার জ্ঞান আছে। চোখ বন্ধ করে আমি পড়ে থাকি। এর মধ্যে অনেক লোক জড়ো হয়। কেউ আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। কেউ বারবার আমার পালস পরীক্ষা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি অনেকটা স্বাভাবিক হই। উঠে বসি।এবার লোকেরা জানতে চায়, আমার কী হয়েছে, বাড়িঘর কোথায়। তাদের বলি, আমার কিছুই হয়নি। কিছুই হয়নি। কীভাবে বলি আমার দুঃখের কথা! তবু চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, আমার দেড় বছরের শিশুপুত্র দুধের অভাবে মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে! কেউ কি আমার সন্তানের জন্য একটা দুধ কেনে দেবেন ভাই? দেবেন?
লেখক: কবি ও সম্পাদক
৩ Comments
অসাধারণ
অসাধারণ
অসাধারণ