কবর থেকে লেখা
এম এ ওয়াজেদ
প্রিয় সন্তান !
আজ বিশ বছর হলো তোমাদের সাথে দেখা হয় না
সেই জবই বিল আগের মতো আছে না
শুকিয়ে গেছে এই পত্র পেলে জানাবে
আর হ্যাঁ তোমার মায়ের হাতের লাগানো
পেয়ারা গাছটি কী মারা গেছে?
আমাদের শোবার ঘরে নিম গাছের যে খাট ছিলো
বিয়ের পরে শ্বশুর সাহেব তার শৌখিন মেয়ে
মানে তোমার মাকে উপহার দিয়েছিলো
আমার মৃত্যুর পর খাটটি পাশের বাড়ির
অন্ধ বৃদ্ধা সখিনা বেওয়াকে দেয়ার কথা ছিলো
সখিনা বেওয়া সেদিন সকালে বলে গেছে
সেই খাট নাকি বিক্রি করে খেয়ে ফেলেছো
প্রিয় সন্তান !
জানালার ধারে খুব যত্ন করা
একটি গোলাপ গাছের চারা ছিল
যৌবনে গোলাপ ফুলের পাপড়িতে
মৌমাছির আনন্দ মিছিল আমাদেরকে মুগ্ধ করতো
পাড়ার যে দুষ্ট ছেলেরা গোলাপের পাতাগুলো
ছিঁড়ে ফেলে পায়ে দলেছিলো
শুনেছি তারা আজো অশিক্ষিত মূর্খ আছে
গ্ৰামের মেট্রিক ফেল খবিরুদ্দী মাতব্বর
দিনমজুর সোহাগ মিয়ার বসতভিটা জাল করে
পাঁচ বছরের জন্য জেলে গিয়েছিলো
সে মারা গেছে কী না জানাবে
ক্ষুধার তাড়নায় পশ্চিম পাড়ার দাউদ ফকির
বট গাছে রশি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো
পারলে তার বিধবা স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিও
প্রিয় সন্তান !
করিম চেয়ারম্যানের নাম তোমার মনে আছে নিশ্চয়
রাতের অন্ধকারে সে একদিন
এতিম কিশোরী জরিনার ঘরে ঢুকেছিলো
আমার মৃত্যুর ছয় মাস পূর্বে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে
একটি বাচ্চা ছেলে প্রসব করেছিলো
মেয়েটি ধর্ষণের বিচার পেয়েছে কী না জানাবে
তোমার দাদার রেখে যাওয়া চার কাঠার পুকুরে
এখন নাকি কচুরিপানা ও সাপেরা বসবাস করে
আসলে তোমরা হারিয়ে ফেলেছো রুচির স্বাদ
পাশের বাড়ির রুমাকে তো চিনতে
ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলো
তার গরিব বাবা আকবর আলি বলেছিলো
” মাষ্টার মশাই , দোয়া করবেন মেয়ে যেনো ডাক্তার হয়”
সেই রুমা কী ডাক্তার হয়েছে জানাবে
প্রিয় সন্তান !
আমাকে কবরে রেখে যাওয়ার পর
যে দুজন ফেরেশতা এসে
কাফনের কাপড় খুলে আমাকে জাগিয়ে তোলে
ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকি
চোখের সামনে তুলে ধরে আমার আমলনামা
তারা আমলনামা পড়তে বলে আর প্রশ্ন করে
আমলনামা পড়তে পড়তে আর
তাদের প্রশ্নগুলো শুনে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে
আমার মনে পড়ে অবাধ্য যৌবনের হাজারো নষ্টালজিয়া
পৃথিবীর সুখ বাতায়নে স্বার্থ-দ্বন্দের অসুখী চৌকাঠে
মনে হয় নিঃশেষ করেছি সম্ভাবনার অনন্ত জীবন
অতএব হে আমার প্রিয় সন্তান !
মরীচিকার আনন্দনৃত্যে বিলিয়ে দিওনা তোমার সুখস্বপ্ন

