আধুনিকতার মুখোশে নৈতিকতার সংকট
রুমানা আক্তার রত্না
দীর্ঘদিন অপেক্ষা ও ব্যর্থতার পর যেমন একজন মানুষ হতাশায় ডুবে যায়, তেমনি দীর্ঘদিন একই পাপ করতে করতে মানুষের ভেতর থেকে পাপবোধও কমে যায়। মানুষ অভ্যাসের দাস—কিন্তু যারা অভ্যাসকে দাসে পরিণত করতে পারে, তারাই প্রকৃত সফল। যদিও সফলতার কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই।
বর্তমান সময়ে মানুষ পাপকে আর পাপ হিসেবে বিবেচনা করে না। এর পেছনে আধুনিক সমাজ অনেকাংশে দায়ী। আজ প্রত্যেকের হাতেই যেন একটি ‘পাপের বাক্স’—হাতে না পেলেও চোখের সামনে থাকে। দিনের বেলায় সাধু সেজে থাকা মানুষ রাতের আঁধারে রূপ নেয় নরপশুতে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়—মানুষ আজ নিজের সঙ্গেই নিজে জুলুম করে; যত্ন করে দুঃখ পোষে।
পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে আমরা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আদর্শ। সমাজের ভয় থাকলেও মানুষ ভয় পায় না রাকিব ও আতিদকে—যারা আমাদের দৈনন্দিন সকল কাজ লিপিবদ্ধ করছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মানুষকে যেমন সহজ জীবন দিয়েছে, তেমনি করেছে অলস ও নির্ভরশীল। চিন্তাশক্তি কমছে, লজ্জাবোধ ক্ষীণ হচ্ছে, বিবেক নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।
আজ মনে হয় পোলিও, টিটেনাস বা টাইফয়েডের টিকার সঙ্গে লজ্জারও বিবেকের একটি ডোজ প্রয়োজন। উনবিংশ বা বিংশ শতকের পোশাকে যে শালীনতা ছিল, আজ তা পরিবর্তিত হয়েছে। অনেকে ছোট পোশাককে আধুনিকতা মনে করে। কিন্তু আধুনিকতা কখনোই কেবল বাহ্যিক নয়—এটি চিন্তায়, আচরণে, নৈতিকতায়।
আমরা অনুকরণপ্রিয় জাতি। পশ্চিমা সংস্কৃতির নামে নারী স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, আর পর্দা মানে কেবল বাহ্যিক আবরণও নয়। আত্মনির্ভরশীলতা পোশাকে নয়—চিন্তায় ও চরিত্রে।
যে জাতির লজ্জা যত কম তারা পাপকর্মে ততই বেশি উন্নত। মিথ্যা কে যেমন সকল পাপ কর্মের সরদার বা মা বলা হয়। পোশাকের শালীনতা ও সমাজের বহু কোলাহল সৃষ্টি করতে সক্ষম । পোশাকের শালীনতার কথা বলায় এক শ্রেণীর মানুষ যারা নিজেকে মনে করে আত্মনির্ভরশীল তারা নানান মন্তব্য করবে। সেই সাথে সমাজের কিছু কীটকে উদাহরণ হিসেবে দেখাবে যারা নয় দশ বছরের শিশুকে নিজেদের লালসার শিকার বানিয়ে ছিলো। আত্মনির্ভরশীলতা, আধুনিক মানে ছোট পোশাক না। এটা রীতিমতো নারীকে সিস্টেমের জালে জড়িয়ে উলঙ্গ করা। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল থেকে উন্নতি দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাদ বাকি যে দিক উন্নতি হোক বা না হোক দূর্ণীতিতে আমাদের অবস্থান সব সময় উপরে দিকে ধাবিত হচ্ছে।দুর্নীতি আমাদের উন্নয়নের চেয়েও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।জননী জন্মভূমি জন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জননীর কোলে লালিত সন্তান জন্মভূমির জন্য গৌরবের দিশারি। তবে আমাদের জন্মভূমিতে সু-দিন ঘুচেছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থাও শোচনীয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা জোনাকিপোকার পশ্চাতে জ্বলা আলোর মত । নামে আলো হলেও এতে অন্ধকার কাটিয়ে তুলার সম্ভাবনা যেমন নেই তেমনি এই শিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে টিকার কোনো সম্ভাবনা নেই । প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হওয়া কোমলমতি সন্তানগুলো সঠিকভাবে বর্ণমালা ও কার চিহ্ন চিনতে চিনতে মাধ্যমিকে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এতে তারা কার চিহ্ন চিনতে পারুক আর নাই পারুক তেনাদের বেতন আটকায় না। মাধ্যমিকে এসে যখন ইংরেজি গ্রামারে শিক্ষার্থীদের আটকে ফেলে ৬০% ছাত্র হয়ে উঠে শিশু শ্রমিক ছাত্রীরা গোছাতে শুরু করে সংসার। তিন চারটা সন্তান জন্ম দিয়ে না পারে সঠিক ভাবে তাদের দৈনিক পুষ্টিসরবরাহ করতে না পারে তাদের শারীরিক মানসিক চাহিদার বিকাশ ঘটাতে। এতে বছর পর বছর দেশে শুধু দাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় মনিব জন্ম নেয় না। অন্য একশ্রেণি শত চেষ্টায় এমএ, বিএ পাশ করে যখন চাকরির পিছনে দৌড়াদৌড়ি করে জুতার নিচটা ক্ষয়ে যায়। তখন যুবক ছেলে বিশ্বের বাজারে শ্রম বিক্রি করে। নিজের যৌবনে সব সুন্দর মুহূর্তের জলানজলি দিয়ে সংসারে হাল ধরতে হয়। এতে অবশ্য দেশের বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়না কারণ লেখা পড়ার জন্য সতেরো বছর স্কুল কলেজ বিশ্বিবদ্যালয়ে নানান নামে সরকারকে নিয়মিত অর্থ প্রদান করেছে। এখন প্রবাসে এসে দেশে অর্থ পাঠালে ও সরকারের খাতায় যুক্ত হয়। যুবসমাজ একটি দেশের উন্নতির মূল সম্পদ। সেই সম্পদ আমরা ঠিকঠাক মতো কাজে লাগাতে পারলে হয়তো হিউ এন্ড সাং ইবনে বতুতা চোখে দেখা দেশটা আবার আমরাও দেখতাম।তবে এটা আর কোনো ভাবে সম্ভাব না।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত অনেকেই প্রকৃত জ্ঞান ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে।
নেপোলিয়ন বলেছিলেন—“আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেব।” কিন্তু আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত মা পাচ্ছি? র্দূভাগ্য আমরা শিক্ষিত মা পায়নি পেয়েছি আধুনিক মা। যে মা সন্তানের দুষ্টুমি থেকে বাঁচতে বাঘের ভয় দেখায়। খেতে না চাইলে কাটুন দেখায়। ঘুমাতে না চাইলে মোবাইল ধরিয়ে দেয়। কাজের সময় বিরক্ত করলে মোবাইল হাতে দিয়ে বসিয়ে দেয়। হোঁচট খেয়ে পরে গেলে এসে আরো দুঘা বসিয়ে দেয়। এই আধুনিক মায়ের সন্তানরা পড়ে না নজরুল লালন রবীন্দ্রনাথ কে জানে না আহম্মদ ছফা কিংবা মাওলানা ভাসানীকে ।অথবা বদরের কাহিনী উহুদ কাহিনী বিদায় হজ্জের ভাষণ। জানতে চাইনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। কাছের মানুষের প্রতি অন্ধবিশ্বাসের কারণে পুরো জাতির দুশত বছর গোলামী করা বিভীষিকাময় দিনের কথা। বিশ্বাস ঘাতকতার শেষ বিচার কীভাবে হয়েছিলো পৃথিবীতে। হোঁচট খেয়ে শক্ত মাটিকে চেনে না জানতে পারে না বর্ষার মৌসুমে সেই মাটি কেনো নরম হয়ে ওঠে। কত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। নবপ্রজন্ম যদি ইতিহাস না জানে তবে তাদের দ্বারা নব দেশ গঠন করা সম্ভব না।
একাডেমিক পড়াশোনা একটা টিকিট মাত্র। যার দ্বারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া যায়। কিন্তু মনুষ্যত্ব না থাকলে সেই পথে সম্মান মেলে না। নীতি নৈতিকতা শিক্ষা শিশুরা পরিবার ও সমাজ থেকে পাই। তাই আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মের জন্য হলেও নিজেকে পরিবর্তন করা এতে সমাজ আপনা-আপনি পরিবর্তন হয়ে যাবে।

