আলমগীর শুভ জন্মদিন
পুরো নাম মহিউদ্দিন আহমেদ আলমগীর
জন্ম:
৩ এপ্রিল, ১৯৫০
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ছিলেন কলিম উদ্দিন আহম্মেদ ওরফে দুদু মিয়া। যুবক অবস্থায় পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় স্থায়ী হয়েছিলেন তিনি। পরে বিয়ে করে পরিবার নিয়ে ঢাকাতেই বসবাস শুরু করেন দুদু মিয়া।
গোপালপুর গ্রামের সন্তান জাইটের গোষ্ঠীর ছেলে দুদু মিয়ার ঘরে ১৯৫০ সালে ৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ আলমগীর। দুদু মিয়া ঠিকাদারির পাশাপাশি করতেন চলচ্চিত্রের প্রযোজনা। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর প্রযোজকও ছিলেন দুদু মিয়া। সেই দুদু মিয়ার সন্তান চলচ্চিত্র থেকে পিছিয়ে থাকবেন তা কি হয়?
দুদু মিয়ার প্রথম ছেলে মহিউদ্দিন আহমেদ আলমগীর তার প্রথম সিনেমায় অভিনয় করেন ‘আমার জন্মভূমি’তে। এরপর একে একে অভিনয় করেন দস্যুরাণী, চাষির মেয়ে, লাভ ইন শিমলা, মায়ের দোয়া, মরণের পরসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে। অভিনয়ের মাধ্যমে ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে গোপালপুরের সন্তান নায়ক আলমগীরকে কোনোদিন দেখেননি তার এলাকার নতুন প্রজন্মের কেউ। তারা শুধু টিভিতেই দেখেছেন নায়ক আলমগীরকে। মুরুব্বীদের মুখে শুনেছেন আলমগীরের পরিবারের কথা।
শুক্রবার (২ এপ্রিল) সরেজমিনে নবীনগরের গোপালপুরে আলমগীরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাড়িতে ঢুকতে পারে না কোনো গাড়ি। স্থানীয়দের বাড়িঘরের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে যেতে হয় তার বাড়িতে।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রাভিনেতা।আলমগীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক অ্যাকশন, রোমান্টিক অ্যাকশন, ফোক ফ্যান্টাসিসহ সব ধরনের চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন সফল। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক, গায়ক ও পরিচালক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা বিভাগে ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।
আলমগীরের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ১৯৭৩ সালে আমার জন্মভূমি দিয়ে। জিঞ্জীর (১৯৭৮) চলচ্চিত্রে রাজ্জাক ও সোহেল রানার সাথে অভিনয় করে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে নিষ্পাপ চলচ্চিত্র দিয়ে তার পরিচালনায় অভিষেক হয়। মা ও ছেলে (১৯৮৫) ছবিতে দীপক চৌধুরী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীতে অপেক্ষা (১৯৮৭), ক্ষতিপূরণ (১৯৮৯), মরণের পরে (১৯৯০), পিতা মাতা সন্তান (১৯৯১), অন্ধ বিশ্বাস (১৯৯২), দেশপ্রেমিক (১৯৯৪) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে আরও ছয়টি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি নির্মাণ করেন নির্মম।
১৯৭৩-১৯৮৪: চলচ্চিত্রে অভিষেক ও পার্শ্ব চরিত্র সম্পাদনা
আলমগীর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র আলমগীর কুমকুম পরিচালিত যুদ্ধভিত্তিক আমার জন্মভূমি ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায়। তার অভিনীত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল দস্যুরাণী (১৯৭৪)। ১৯৭৫ সালে তিনি শাবানার বিপরীতে চাষীর মেয়ে ও কবরীর বিপরীতে লাভ ইন শিমলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পরের বছর তিনি আলমগীর কুমকুম পরিচালিত গুন্ডা চলচ্চিত্রে রাজ্জাক ও কবরীর সাথে একটি ছোট চরিত্রে এবং তাহের চৌধুরী পরিচালিত মাটির মায়া চলচ্চিত্রে ফারুক ও রোজিনার সাথে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৮ সালে দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত জিঞ্জীর চলচ্চিত্রে রাজ্জাক ও সোহেল রানার সাথে অভিনয় করেন। তিনি আসাদ চরিত্রে কামাল আহমেদ পরিচালিত রজনীগন্ধা (১৯৮২) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এতে তার সহশিল্পী ছিল রাজ্জাক, শাবানা ও অঞ্জনা। ১৯৮৪ সালে তিনি আমজাদ হোসেন পরিচালিত ভাত দে ও সখিনার যুদ্ধ চলচ্চিত্রে কাজ করেন। দুটি ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন শাবানা এবং এর মধ্য দিয়ে শাবানার সাথে তার জুটি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী এক দশক বাংলা চলচ্চিত্রে রাজত্ব করে। ভাত দে ছবিতে তিনি একজন দরিদ্র বাউলের শিষ্য গহর চরিত্রে অভিনয় করেন।
আলমগীর কামাল আহমেদ পরিচালিত মা ও ছেলে (১৯৮৫) চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে দীপক চৌধুরী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তিনি তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র নিষ্পাপ। ১৯৮৭ সালে তিনি শাবানার বিপরীতে অভিনয় করেন মায়ের দোয়া, দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত অপেক্ষা ও সুভাষ দত্ত পরিচালিত স্বামী স্ত্রী চলচ্চিত্রে। অপেক্ষা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর অভিনয় করেন হাফিজ উদ্দীন পরিচালিত পথে হল দেখা চলচ্চিত্রে। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন অঞ্জনা রহমান। পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণ (১৯৮৯), মরণের পরে (১৯৯০), পিতা মাতা সন্তান (১৯৯১), ও অন্ধ বিশ্বাস (১৯৯২) চলচ্চিত্রের জন্য টানা চারবার তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এসময়ে তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হল সত্য মিথ্যা (১৯৮৯), রাঙা ভাবী (১৯৮৯), দোলনা (১৯৯০), অচেনা (১৯৯১), সান্ত্বনা (১৯৯১) ও ক্ষমা (১৯৯২)। ১৯৯৪ সালে অভিনয় করেন কাজী হায়াৎ পরিচালিত নাট্যধর্মী দেশপ্রেমিক, শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত যুদ্ধ-নাট্যধর্মী ঘাতক, ও গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত পারিবারিক-নাট্যধর্মী স্নেহ চলচ্চিত্রে। দেশপ্রেমিক-এ একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি সপ্তমবারের মত শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এই বছর তিনি নির্মাণ করেন নির্মম। এতে তার সাথে অভিনয় করেন শাবানা, শাবনাজ ও বাপ্পারাজ। ছবিটি সমাদৃত হয় এবং শাবনাজ শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৯৫ সালে তিনি দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত কন্যাদান চলচ্চিত্রে পার্শ্ব ভূমিকায় অভিনয় করেন। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন সালমান শাহ ও লিমা। পরের বছর তিনি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন রচিত পোকা মাকড়ের ঘরবসতি উপন্যাস অবলম্বনে আখতারুজ্জামান পরিচালিত পোকা মাকড়ের ঘরবসতি চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয় করেন। এছাড়া পার্শ্ব চরিত্রে সোহেল রানা অভিনীত অজান্তে, সালমান শাহ অভিনীত মায়ের অধিকার ও সত্যের মৃত্যু নাই, ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত দুর্জয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
আলমগীর ২০১০ সালে শাহাদাত হোসেন লিটন পরিচালতি জীবন মরনের সাথী চলচ্চিত্রে আশরাফ চৌধুরী চরিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর অভিনয় করেন কে আপন কে পর, হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ ও তার নিজের প্রযোজিত মাটির ঠিকানা চলচ্চিত্রে। কে আপন কে পর-এ অভিনয়ের জন্য তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মত শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালে ৩৫ বছর পর এফ আই মানিক পরিচালিত জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার চলচ্চিত্রে পুনরায় রাজ্জাক ও সোহেল রানার একসাথে কাজ করেন। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন শাকিব খান ও পূর্ণিমা। ছবিতে আলমগীরকে একজন পুলিশ কমিশনার চরিত্রে দেখা যায়।
তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি হিসেবেও দায়ীত্ব পালন করেন।