৩২১ বার পড়া হয়েছে
এক কিশোরী বধূ ও একটি নাকফুলের গল্প
ফৌজিয়া বীথি
ফৌজিয়া বীথি
________________
আমাদের দেশে বিবাহিত নারীদের বিবাহের প্রতিক হিসেবে ধরা হয় তার নাকের নাকফুল. প্রত্যেক বিয়েতে স্বামীর তরফ থেকে নাকফুল দেয়া হয়. বিয়ের কালেমা পড়ার আগে কনের নাকে নাকফুল পড়িয়ে দেয়া হয়. এই নাকফুল পড়াকে স্বামীর কল্যাণ মনে করা হয়. বিবাহিত মেয়েরা নাকফুল পড়বে এটাই বাংলার রীতি, সংস্কৃতি , ঐতিহ্য. বিবাহিত নারীরা স্বামী যতদিন বেঁচে থাকে নাকে নাকফুল পরতে হয়.
যদি কোন মেয়ে এই রীতির ব্যাতিক্রম ঘটিয়ে নাকফুল না পরে তবে অনেকের অনেক কথার সম্মুখীন হতে হয়. স্বামীর মৃত্যুর পর সেই নাকফুল খুলে ফেলা হয়.
আবার কোন মেয়ের তার স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও এ স্বামীর তরফ থেকে দেয় নাকফুল খুলে ফেলা হয়. এর মাধ্যমে এ স্বামীর পরিচয় মুছে ফেলা হয়.
.
এমনি এক কিশোরী বধূ্র বিবাহ বিচ্ছেদ হলে মেয়েটি নাক থেকে নাকফুলটি খুলে যত্নে রেখে দিয়েছিল. হঠাৎই অনেক গুলো বছর পরে গহনার বাক্সের ভারী গহনা গুলোর ফাঁকে চোখ স্হির হয়ে যায় সেই নাকফুলটির প্রতি. অনেক গুলো বছর পর সেই অতীত জীবনের ঐ একমাত্র স্মৃতি চিহ্ন দেখে মেয়েটির বুকের ভেতরটায় কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে. যদিও সেই স্মৃতির তার কাছে থাকবার কথা নয় . ঐ নাকফুটির সাথে জড়িয়ে আছে অনেক কষ্ট যন্ত্রনার কালো স্মৃতি. কবেই তো সেই নাকফুল দেয়া মানুষটির সাথে তার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে. তবুও অনেক গুলো বছর পর পাওয়া নাফুলটি সে নেড়ে চেড়ে দেখছিলো.
.
মেয়েটির বিচ্ছেদের পর মেয়েটির কিছু আত্মীয় মহিলা নাকফুটি ফেলে দিতে বলেছিলো,কেউ অন্য কোন মেয়েকে দিতে বলেছিলো,কেউ কেউ মসজিদে দান করে দিতেও বলেছিলো.
কিন্তু মেয়েটি অন্য কোন মেয়ের বিয়েতে ঐ নাকফুল টি দিতে পারেনি কারণ তার কাছে ঐ নাকফুটি অভিশপ্ত মনে হয়েছে. এই অশুভ নাকফুল টি যে মানুষটি তাকে দিয়েছিল তাকে সে ধরে রাখতে পারেনি.
নাকফুল টি তার বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারেনি.. তাই মেয়েটির কাছে নাকফুল টি অভিশপ্ত. সে মনে মনে ভাবতো এই নাকফুল টি যদি অন্য কোন মেয়ের নাকে ওঠে তাতে যদি তার বিবাহটাও ভেঙে যায় কিংবা প্রিয় মানুষকে ধরে রাখতে, সম্পর্ক কে ধরে রাখতে না পারে. সে নাকফুল টি ফেলে দিতে চেয়েও তা পারেনি যদি কোন মেয়ে কুড়িয়ে পেয়ে নাকফুল টি নাকে পড়ে তাতে যদি মেয়েটির ক্ষতি হয়.
মসজিদেও ঐ অভিশপ্ত নাকফুল টি দিতে চায়নি . হয়তো ভেতরে ভেতরে নাকফুলটির প্রতি তার মায়া ছিল.এই সব ভেবেই মেয়েটি তার নাকফুল টি যত্ন করে রেখে দিয়েছিল. যদিও জানতো এই নাকফুল টি আর কোন দিনও পড়া হবে তার.
.
চোখ দুটো যদিও অশ্রুতে ভরে উঠেছিল. মেয়েটি যদিও মনে মনে হাসছিল আর শ্বাশুড়ির কথা ভাবছিলো- একদিন এই সামান্য সোনার নাকফুল টি স্বামীর করা আঘাতে নাকফুল পড়া অনভ্যস্ত মেয়েটির নাক থেকে পড়ে হারিয়ে গিয়েছিল আর তাতে শ্বাশুড়ি ননদিনির কত কথা একদম শোরগোল ফেলে দিয়েছিল..! অপায়া মেয়ে,অলক্ষী মেয়ে,সর্বনাশি,গেছো মেয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি . কত চিন্তা ছেলের অমঙ্গল হবে, স্বাস্থ্য হানী হবে,আয়ু কমে যাবে ,আরোও কত কথা ..! মেয়েটি মনে মনে বলছিল- নাকের নাকফুল কেন অন্যের আয়ু বাড়াবে , কেন তাতে স্বামীর অকল্যাণ হবে. যখন মেয়ের হাত কান গলা থেকে একেরপর এক বাবার দেয়া গহনা খুলে বিক্রি করা হয়েছিল তখন তো কেউ টু শব্দটি করেনি. আঙুল থেকে আংটি খুলে বিক্রি করবে বলে আঙ্গুল থেকে আংটি খুলতে আঙ্গুল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল তখন তো কেউ চিল্লাচিল্লি করেনি. কেউ শোনেনি মেয়েটির কাঁন্না.
.
শ্বাশুড়ি মানুষ টি কিশোরী বধূ্র কাছে যমের মতো ছিল. সেই ঐ সংসারের সর্বময় কর্তা ,তার কথাই শেষ কথা. মেয়েটির বেলায় খুব হিসেবি ছিলেন শ্বাশুড়ি মানুষ. বৌকে স্বর্ণ দিয়ে কাটা নষ্ট করে লোকসানের খাতাটা ভারী করতে চান নাই. তাই সোনা আর দস্তার মিশ্রনে ছোট একটা নাকফুল দেয়া হয়েছিল. খুব দূরদর্শী মহিলা কি না..! তাছাড়া শ্বাশুড়ি ননদিনি জানতো তাদের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে এই সহজ-সরল মেয়েটি তাদের সংসারে টিকতে পারবে না. সে মন থেকে ছেলের বৌ নয় চেয়েছিলো ছেলের বৌয়ের বাবার অর্থসম্পত্তি. যখন মেয়েটি তাদের কথা মতো বাবার কাছে থেকে টাকা এনে দিতে অস্বীকার করলো মেয়েটির উপর তখন চলতে থাকে অকথ্য শারিরীক মানসিক নির্যাতন. মেয়েটি শত নির্যাতন উপেক্ষা করে ঐ সংসারে থাকতে চেয়েলিলো কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা এতোটাই তীব্র হয়েছিল যে তিন দিনের অভুক্ত মেয়েটি বাবার বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল. কত রকম যে ফন্দী বিয়েটা ভেঙ্গে দেবার. সেই তীব্র জেদ মনে পুষে রেখেছিলেন শ্বাশুড়ি মানুষটি. হ্যাঁ শেষ পর্যন্ত তিন দিনের অভুক্ত মেয়েটিকে তাড়িয়ে দেয় হয়. বিবাহ বিচ্ছেদ হয় মেয়েটির. এটা অমানুষের সাথে মানুষের বিচ্ছেদ হয়. . তালাকের পর নাক থেকে নাকফুল টি খুলে রাখতে গিয়ে মেয়েটির কান্নায় আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল.
মেয়েটি মনে মনে বলেছিল- সামনের সময়টাতে আমি নিশ্চয়ই ভালো থাকবো. হয়তো একা , অথবা অন্য কারোর সাথে. সেই পাষন্ডও ভালো থাকবে হয়তো অন্য কারোর সাথে.
.
মেয়েটি অবলা নয়. মেয়েটি সাধারণ নয়.
মেয়েটি অধিকার আদায় করতে জানতো.
মেয়েটি বিদ্রোহী.
কিন্তু মেয়েটির ভেতরে একজন প্রেমিকা বাস করতো.
একজন মানুষ বাস করতো,মেয়েটি একজন মানবিক মানুষ.
মেয়েটি ভালবাসায় কঠিন হবার আগে কোমল হতে জানে.
মেয়েটি তার সমস্ত ভালবাসা দিয়ে , ত্যাগ দিয়ে হাজার বিপর্যয়ের ভালবাসার মানুষটির হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে চেয়েছিল.
কিন্তু প্রচন্ড আত্মাভিমানী মেয়েটি এতোটা অপমান উপেক্ষা মেনে নিতে পারেনি.
ভালবাসাহীন শুধু স্বার্থের সম্পর্ক রাখতে চায়নি মেয়েটি.
কারণ মেয়েটি জানতো- অধিকার ছাড়িয়া দিয়া ধরিয়া রাখার মত বিড়ম্বনা আর কিছু নেই.
তাই বিয়ের বাঁধনটা সে আলগা করে দিয়েছিলো.
মেয়েটির একটাই ভুল জীবন সঙ্গী হিসেবে সে একজন প্রেমিক পুরুষ চেয়েছিলো.
পুরুষ নয়, ফেরেস্তা নয় একজন মানবিক মানুষ চেয়েছিলো.
স্বার্থহীন নিখাদ ভালোবাসা চেয়েছিলো.
তেমন মানুষ মিলবে কিনা মেয়েটি জানতো না.
সহজ সরল মেয়েটি এই জীবন সংসারের জটিল নিয়মগুলো জানতো না.
.
প্রথম স্বামীর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করা মেয়েটির পুরুষের প্রতি তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল.
মনে মনে ভেবেছিল পৃথিবীতে ভালবাসা বলে কিছু নেই.
মেয়েটি জানতো না ডিভোর্সি মেয়েকে কোন পুরুষ গ্রহণ করবে কি না.
এই নষ্ট সমাজ তাকে ভালো ভাবে বাঁচতে দেবে কি না..!
তবুও প্রচন্ড আত্মবিস্বাসী মেয়েটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়.
তার আত্মবিশ্বাস ছিল – সে তার সমস্ত ভাল , সমস্ত ভালবাসা,ত্যাগ উদারতা আর দৃঢ় প্রত্যয়ি ব্যাক্তিত্ব দিয়ে সব অর্জন করতে পারবে.
তারপর বহু বছর মেয়েটি আর নাকফুল পড়েনি.
.
মানুষের আকাশটা বদলায়.
স্বপ্নেরও হারিয়ে যায়.
প্রিয় রং বদলায়.
ভালবাসার রুপান্তর ঘটে.
মানুষের সন্ধনে ভালবাসা বেঁচে থাকে একই ধারায়.
একই গভীরতায়..